মেয়াদ শেষ, তবুও মিলছে না বীমার টাকা
রাজবাড়ীতে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের অফিস বন্ধ, দুশ্চিন্তায় প্রায় দুই হাজার গ্রাহক
চেয়ারম্যানসহ প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা গ্রাহকদের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ঘটনায় সারা দেশে গ্রাহকরা মামলা করেছেন
১০ বছর ধরে সংসারের খরচ সংকুচিত করে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে সঞ্চয় করেছিলেন রাজবাড়ী পৌর শহরের ধুঞ্চি গ্রামের গৃহবধূ শিল্পী খাতুন। মেয়াদ শেষে লভ্যাংশসহ জমানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় ছিলেন তিনি। কিন্তু পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় পাঁচ বছর আগে। এখনো সেই টাকা ফেরত পাননি তিনি।
শিল্পী খাতুনের মতো রাজবাড়ীতে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের প্রায় দুই হাজার গ্রাহক বীমার টাকা ফেরত না পেয়ে ভোগান্তিতে রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক গ্রাহকের পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে কয়েক বছর আগে। কেউ কেউ বছরের পর বছর কোম্পানির অফিসে ঘুরেও টাকা না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার এক থেকে দুই মাসের মধ্যে লভ্যাংশসহ বীমার টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে। টাকা ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে তাদের বিভিন্ন অজুহাতে ঘোরানো হচ্ছে। একপর্যায়ে রাজবাড়ী জোনাল অফিসও প্রায় তিন মাস বন্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
পাঁচ বছরেও ফেরত পাননি শিল্পী
শিল্পী খাতুন বলেন, সংসারের ব্যয় সামলে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে ১০ বছর বীমার কিস্তি দিয়েছেন। পাঁচ বছর আগে পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কোনো টাকা পাননি। নিজের জমানো টাকা ফেরত পেতে তিনি একাধিকবার কোম্পানির অফিসে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।
তার মতো অনেক গ্রাহকও একই সমস্যায় পড়েছেন বলে জানান তিনি।
২০২১ সাল থেকে ঘুরছেন আলমগীর
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার চর আড়কান্দি গ্রামের আলমগীর হোসেনও প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে বীমার কিস্তি দিতেন। তাঁর পলিসির মেয়াদ শেষ হয় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
আলমগীর হোসেন বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পাওনা টাকা নিতে প্রথমে বালিয়াকান্দি অফিসে যোগাযোগ করেন। দীর্ঘদিন সেখানে ঘোরার পর একপর্যায়ে ওই অফিস বন্ধ হয়ে যায়। এরপর রাজবাড়ী জোনাল অফিসে যোগাযোগ শুরু করেন। বছরের পর বছর ঘুরেও টাকা পাননি।
তার ভাষ্য, অফিস থেকে তাকে জানানো হয়েছে—কোম্পানির অর্থ লুট হয়ে যাওয়ায় গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। নিজের জমানো টাকা ফেরত পেতে গিয়ে এখন তাকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
প্রায় ৬ লাখ টাকা আটকে আব্দুস সাত্তারের
রামকান্তপুর ইউনিয়নের কাজীবাধা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে ১০ বছর মেয়াদি বীমা করেছিলেন। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে তাঁর পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু আজও তিনি কোনো টাকা ফেরত পাননি।
আব্দুস সাত্তার বলেন, তাঁর প্রায় ছয় লাখ টাকা কোম্পানির কাছে আটকে আছে। নিজের জমানো টাকা ফেরত না পাওয়ায় তিনি আর্থিক সংকটে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে টাকা ফেরতের জন্য ঘুরলেও কোনো সমাধান হয়নি। এ টাকা ফেরত পেতে সরকারের সহযোগিতা চান তিনি।
কোটি কোটি টাকা পাওনার অভিযোগ
গ্রাহকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাগর সরদারের ১০ বছর মেয়াদি পলিসিতে ৫৯ হাজার ৮৮৪ টাকা, নার্গিসের ৩৪ হাজার ১২৬ টাকা, মো. আলীর দুটি ১০ বছর মেয়াদি পলিসিতে প্রায় দুই লাখ টাকা, জাহাঙ্গীর শেখের চার লাখ ৫৭ হাজার ২১০ টাকা, জাকির হোসেনের ৬২ হাজার ৬৬০ টাকা এবং মো. সাবুর ছয় লাখ ১১ হাজার ৬৭৫ টাকা পাওনা রয়েছে।
এ ছাড়া আরও বহু গ্রাহকের বীমার টাকা মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে রাজবাড়ী জোনের আওতায় গ্রাহকদের কয়েক কোটি টাকা আটকে থাকার দাবি ভুক্তভোগীদের।
১০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে মেয়াদ শেষ ১,৮১৫ জনের
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের রাজবাড়ী জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ জোনের আওতায় বিভিন্ন মেয়াদের প্রায় ১০ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৮১৫ জন গ্রাহকের বীমা পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
অফিস সূত্রের দাবি, কোম্পানির হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকায় মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসির টাকা গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। গ্রাহকদের চাপ ও ক্ষোভের কারণে রাজবাড়ী জোনাল অফিস প্রায় তিন মাস বন্ধ ছিল বলেও সূত্রটি জানিয়েছে। বর্তমানে গ্রাহকদের ভয়ে অনেক সময় অফিস তালাবদ্ধ রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ’
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের রাজবাড়ী জোনাল ইনচার্জ মো. মোজাম্মেল হক বলেন, রাজবাড়ীতে ১০ হাজারের বেশি গ্রাহক রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকের ডিপোজিটের মেয়াদ শেষ হলেও কোম্পানির মালিকানা ও আর্থিক জটিলতার কারণে টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি দাবি করেন, ‘‘আগের চেয়ারম্যানসহ প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা গ্রাহকদের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ঘটনায় সারা দেশে গ্রাহকরা মামলা করেছেন।’’
মোজাম্মেল হক আরও বলেন, বর্তমানে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম। বিষয়টি সরকার হস্তক্ষেপ করেছে। প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে তিনি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন।
কবে মিলবে গ্রাহকদের টাকা?
বছরের পর বছর প্রিমিয়াম পরিশোধ করে মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে গ্রাহকদের মধ্যে। কেউ সন্তানের পড়াশোনা, কেউ চিকিৎসা, আবার কেউ অবসর জীবনের নিরাপত্তার জন্য বীমায় টাকা জমিয়েছিলেন। এখন মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সেই অর্থ হাতে না আসায় তাদের অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
গ্রাহকদের প্রশ্ন—পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যদি বছরের পর বছর টাকা ফেরত না পাওয়া যায়, তাহলে বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা থাকবে কীভাবে?
ভুক্তভোগীরা দ্রুত তাদের পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম ও গ্রাহকের অর্থ আটকে থাকার বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই সংকটের দ্রুত সমাধান চান তারা।
Shamiur Rahman
