"সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ বনাম অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল’’
ভালো উদ্দেশ্যের একটি বিধানও ভুল কাঠামোয় গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ফল তৈরি করতে পারে
গ্রাহক কল্যাণ তহবিল গঠনের উদ্যোগকে আমি কিন্তু সমস্যার সমাধানের অংশ হিসেবেই দেখি। ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতার বিপদে পাশে দাঁড়ানো, মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক চাপ কমানো এবং গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসবের প্রয়োজন আছে। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই কোনো বিধান ভালো ফল দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এখন প্রশ্ন হলো, গ্রাহককে সুরক্ষা দিতে গিয়ে আমরা এমন কি ব্যবস্থা তৈরি করছি, যার খরচ শেষ পর্যন্ত গ্রাহককেই অন্যভাবে বহন করতে হবে।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) কর্তৃক প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহক কল্যাণ তহবিল বিধিমালায় ঋণ বিতরণের সর্বোচ্চ ০.৬ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ এই তহবিলে রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে পৃথক হিসাব, গ্রাহককে লিখিতভাবে অবহিত করা, মৃত্যুজনিত ঋণ মওকুফ, বৈধ উত্তরাধিকারীকে সঞ্চয় ফেরত, দাফন-সৎকার সহায়তা, নিরীক্ষা এবং অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, উদ্দেশ্যগুলো মানবিক এবং অবশ্যই প্রয়োজনীয়।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—০.৬ শতাংশ কি এই বিধিমালার প্রকৃত খরচ? সম্ভবত না! তহবিলে জমা দেওয়া অর্থের বাইরে পৃথক হিসাবরক্ষণ, তথ্য সংরক্ষণ, গ্রাহককে অবহিতকরণ, দাবি যাচাই, উত্তরাধিকারী শনাক্তকরণ, নিরীক্ষা, প্রতিবেদন, অভিযোগ নিষ্পত্তি, সফটওয়্যার পরিবর্তন এবং কর্মীদের অতিরিক্ত সময়—সব মিলিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত বিধি-পরিপালন ব্যয় অনেক বেশি হতে পারে। এই ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্ষুদ্রঋণ খাতের সব প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের আর্থিক সক্ষমতার নাই। বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য যে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় সামলানো সম্ভব, ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য তা তুলনামূলকভাবে বড় চাপ হয়ে দাড়াবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায়, উপকূলীয় এলাকায়, দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলিতে পরিচালিত কম-লাভজনক শাখাগুলোর ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি হতে পারে।
তখন একটি নীতিগত প্রশ্ন উঠবেই: একজন গ্রাহককে সুরক্ষা দিতে গিয়ে যদি সেবার খরচ বাড়ে, শাখা পরিচালনা কঠিন হয় কিংবা প্রত্যন্ত এলাকায় কার্যক্রম সংকুচিত হয়—তাহলে সেই নীতির ফলাফল কোথায় গিয়ে দাড়াবে? এখানেই ‘সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের’ পার্থক্য।
আরও একটি বিষয় উপেক্ষা করার সুযোগ নাই, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি গ্রাহকের কাছ থেকে অনুমোদিত সীমার বেশি অর্থ নিয়ে থাকে বা তহবিল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করে থাকে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের প্রতিকার করতে গিয়ে পুরো খাতকে একইমাত্রার অতিরিক্ত প্রশাসনিক বোঝা কেন বহন করতে হবে ?
এটি শুধু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন নয়; এটি শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের প্রশ্ন। কারণ পরিচালন ব্যয় বাড়লে প্রতিষ্ঠানকে কোথাও না কোথাও তার মূল্য দিতে হয়। কম লাভজনক শাখা সংকুচিত হতে পারে, নতুন শাখা খোলার আগ্রহ কমতে পারে, প্রত্যন্ত এলাকায় সেবা কমতে পারে। তখন যে গ্রাহক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে ক্ষুদ্রঋণের ওপর নির্ভর করছেন, তিনিই সবচেয়ে আগে সমস্যায় পড়বেন। তাই বিধিমালার উদ্দেশ্যকে অক্ষুণ্ন রেখে এর কাঠামোকে আরও বাস্তবসম্মত করা জরুরি।
প্রথম কাজ: ০.৬ শতাংশকে চূড়ান্ত হার হিসেবে নির্ধারণের আগে পুরো খাতের ওপর এর আর্থিক প্রভাব মূল্যায়ন করা দরকার। তহবিলে কত টাকা জমা হবে—এটি একটি হিসাব। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত মোট বিধি-পরিপালন ব্যয় কত, সেটিই আসল হিসাব। নীতিনির্ধারণে এই হিসাবটি বাদ গেলে একটি ভালো উদ্যোগও অপ্রত্যাশিত আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
দ্বিতীয় কাজ: বড় ও ছোট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এক নয়। তাই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও অনুপাতভিত্তিক পদ্ধতি প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের আকার, কার্যক্রমের পরিধি ও ঝুঁকি বিবেচনায় বিধি-পরিপালনের মাত্রা নির্ধারণ করা যেতে পারে। ঝুঁকি বেশি হলে নিয়ন্ত্রণ কঠোর হবে; কিন্তু ঝুঁকি কম হলে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বোঝা কম থাকবে।
তৃতীয় কাজ: কেউ নিয়ম ভাঙলে পুরো খাতকে শাস্তি দেওয়ার মতো কাঠামো কার্যকর হতে পারে না। অনুমোদিত সীমার বেশি অর্থ নেওয়া, তহবিল অপব্যবহার বা গ্রাহককে বিভ্রান্ত করার মতো অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে তদারকি ও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নিয়ম ভাঙার দায় ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের; পুরো খাতের নয়।
চতুর্থ কাজ: তহবিলের অর্থ পৃথকভাবে হিসাব করা অবশ্যই দরকার। কিন্তু প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে ভিন্ন পদ্ধতিতে হিসাব করতে দিলে জটিলতা বাড়বে। একটি মানসম্মত হিসাবরক্ষণ কাঠামো ও অভিন্ন হিসাব-ছক থাকলে স্বচ্ছতা যেমন বাড়বে, তেমনি তদারকিও সহজ হবে।
পঞ্চম কাজ: মৃত্যুর পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বৈধ উত্তরাধিকারীকে সঞ্চয় ফেরত দেওয়ার বিধান মানবিক। কিন্তু বাস্তবে মৃত্যু সনদ, পরিচয়পত্র, উত্তরাধিকার সনদ, একাধিক উত্তরাধিকারী কিংবা দাবিদারের বিরোধ দেখা দিতে পারে। তাই শুধু সময়সীমা নির্ধারণ করলেই হবে না; একটি সহজ, অভিন্ন ও নির্ভরযোগ্য যাচাই পদ্ধতিও থাকতে হবে। দ্রুত নিষ্পত্তি ও নির্ভুল যাচাই—দুটিই একসঙ্গে দরকার।
ষষ্ঠ কাজ: গ্রাহকের মৃত্যুর পর পরিবারের ওপর ঋণের বোঝা না চাপানো অবশ্যই মানবিক। কিন্তু এ সুবিধার অপব্যবহার রোধে মৃত্যু, ঋণের অবস্থা ও প্রকৃত দাবিদার যাচাইয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রয়োজনে এ ধরনের ঝুঁকি বীমা বা অন্য কোনো ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে।
সপ্তম কাজ: দাফন-সৎকার বা জরুরি সহায়তা গ্রাহকের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু তহবিলের আয় ও সম্ভাব্য ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে একসময় এর সক্ষমতা কমে যেতে পারে। কল্যাণের অর্থ শুধু আজ দেওয়া নয়; আগামীকালও যেন তহবিলটি দিতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করা।
অষ্টম কাজ: বেতন, সাধারণ প্রশাসনিক ব্যয়, খেলাপি ঋণ সমন্বয় বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি পূরণে তহবিলের অর্থ ব্যবহার করা যাবে না—এটি স্পষ্ট থাকা দরকার। একই সঙ্গে অপব্যবহারের ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
নবম কাজ: পুরো খাতে একবারে বিধিমালা কার্যকর করার আগে নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠান ও অঞ্চলে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা যেতে পারে। এতে মাঠপর্যায়ে কোথায় জটিলতা, অতিরিক্ত ব্যয় বা গ্রাহকসেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তা বোঝা যাবে। মাঠের বাস্তবতা না দেখে কাগজের বিধান চূড়ান্ত করা উচিত নয়।
দশম কাজ: বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর ১৮–২৪ মাসের মধ্যে বাধ্যতামূলক পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। গ্রাহক কতটা উপকৃত হয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কত বেড়েছে, অভিযোগ কমেছে কি না এবং প্রত্যন্ত এলাকায় সেবা কমেছে কি না—এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিধান সংশোধন করা উচিত। কারণ কোনো বিধিমালাই চূড়ান্ত নয়; বাস্তবতা বদলালে নীতিও পর্যালোচনা করতে হয়।
নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য সেবা সংকুচিত করা নয় -কারণ গ্রাহক কল্যাণ তহবিলের প্রয়োজন নিয়ে বিতর্ক করার চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—এর কাঠামোটি কতটা বুদ্ধিমান, ন্যায়সংগত এবং বাস্তবসম্মত হবে। একদিকে গ্রাহকের অর্থ ও অধিকার রক্ষায় শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ দরকার। অন্যদিকে এমন বিধিও কাম্য নয়, যার প্রশাসনিক ব্যয় শেষ পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণসেবাকে ব্যয়বহুল করে তোলে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের সেবা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
ভালো বিধিমালা তাকেই বলা যায়, যা অনিয়মকারীর জন্য কঠোর, সৎ প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচালনাযোগ্য এবং গ্রাহকের জন্য বাস্তব উপকারী। গ্রাহককে সুরক্ষা দিতে গিয়ে যেন আমরা এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি না করি, যার অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ শেষ পর্যন্ত আরও অনেক গ্রাহকের সামনে ক্ষুদ্রঋণ ও আর্থিক সেবার দরজা সংকুচিত করে দেয়।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী
Shamiur Rahman
