প্রযুক্তি জায়ান্ট প্যালান্টিরের কর এড়ানোর বৈশ্বিক কৌশল ফাঁস!
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্স অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড রিসার্চ (সিআইসিটিএআর) প্রকাশিত এই প্রতিবেদন এমন সময় সামনে এসেছে, যখন প্যালান্টির গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে
মার্কিন ডেটা অ্যানালিটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কোম্পানি প্যালান্টির টেকনোলজিস এমন একটি করপোরেট কাঠামো তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে কার্যত কোনও ফেডারেল করপোরেট আয়কর পরিশোধ করছে না- এমন অভিযোগ উঠেছে একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্স অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড রিসার্চ (সিআইসিটিএআর) প্রকাশিত এই প্রতিবেদন এমন সময় সামনে এসেছে, যখন প্যালান্টির সরকারি চুক্তির সুবাদে দ্রুত রাজস্ব বৃদ্ধি করছে এবং একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে।
প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে?
সপ্তাহের শুরুতে প্যালান্টির জানায়, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৩ শতাংশ বেশি। তবে এত দ্রুত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সিআইসিটিএআর-এর দাবি, ২০২৫ সালে কোম্পানিটির কার্যকর বৈশ্বিক করহার মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে সম্পাদিত সরকারি ও বেসরকারি চুক্তি থেকে অর্জিত মুনাফার বড় অংশ হিসাবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত মূল কোম্পানির হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। ফলে যেখানে প্রকৃত কাজ পরিচালিত হয়, সেই দেশগুলোতে করযোগ্য মুনাফা তুলনামূলকভাবে খুব কম দেখানো হয়।
যুক্তরাজ্যে প্যালান্টির ২০২৪ সালে করপোরেট কর বাবদ প্রায় ২০ লাখ পাউন্ড (প্রায় ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার) পরিশোধ করেছে, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির সরকারের কাছ থেকে ৬৭০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি (প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের চুক্তি পেয়েছে।
সিআইসিটিএআর-এর দাবি, কোম্পানিটি মুনাফা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করে, যেখানে আগের বছরের লোকসান, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে কর সুবিধা এবং বিভিন্ন ছাড় ব্যবহার করে কার্যত ফেডারেল আয়কর এড়িয়ে যায়।
প্রতিবেদনটি কোনও ব্যবস্থাকেই অবৈধ বলে অভিযোগ করেনি। তবে প্রশ্ন তুলেছে- বিশ্বজুড়ে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিপুল চুক্তি পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে এত সামান্য কর দিয়ে থাকে?
প্যালান্টিরের এক মুখপাত্র ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সব দেশের কর আইন সম্পূর্ণভাবে মেনে চলে। তার ভাষায়, “ট্রান্সফার প্রাইসিং একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বহুল ব্যবহৃত হিসাব পদ্ধতি, যা প্রায় সব বড় বহুজাতিক কোম্পানিই ব্যবহার করে।”
প্যালান্টির কী?
২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত প্যালান্টিরের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী বিলিয়নিয়ার পিটার থিয়েল। কোম্পানিটি শুরুর দিকে সিআইএ-সমর্থিত প্রযুক্তি বিনিয়োগ তহবিল ইন-কিউ-টেল-এর আর্থিক সহায়তা পায়।
বৃহস্পতিবার নাসডাকে প্রাথমিক লেনদেনে কোম্পানিটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন ডলার, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তালিকাভুক্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
প্যালান্টির যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষের জন্য তথ্য বিশ্লেষণ ও এআইভিত্তিক সফটওয়্যার সরবরাহ করে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক
প্যালান্টির নিজেই জানিয়েছে, তাদের ইসরায়েলের সঙ্গে একটি ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ রয়েছে এবং ২০১৫ সালে তারা সেখানে অফিস স্থাপন করে।
সিআইসিটিএআর-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলে প্যালান্টির সফটওয়্যারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে একটি বড় কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ওপেন ইন্টেল-এর তথ্যানুযায়ী, প্যালান্টির ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট ইউনিট ৮২০০-এর সাবেক সদস্যদেরও নিয়োগ দিয়েছে।
অ্যালেক্স কার্প প্রকাশ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, “আমি ইসরায়েলের সবচেয়ে প্রকাশ্য সমর্থক সিইও। ”
যুক্তরাষ্ট্রে কর কত?
সিআইসিটিএআর-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্যালান্টির যুক্তরাষ্ট্রে কোনও ফেডারেল করপোরেট আয়কর দেয়নি এবং অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে আয়কর দিয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। এটি টানা তৃতীয় বছর, যখন প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল করপোরেট আয়কর শূন্য দেখিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছরের লোকসান, গবেষণা ও উন্নয়ন কর-সুবিধা এবং কর্মীদের দেওয়া শেয়ারভিত্তিক প্রণোদনার কারণে কোম্পানিটি ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি স্থগিত কর-সম্পদ গড়ে তুলেছে। এই সুবিধা ব্যবহার করে ভবিষ্যতের প্রায় ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মুনাফার ওপরও ফেডারেল কর এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
ইউরোপে কর কমানোর কৌশল
সিআইসিটিএআর বলছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্যালান্টিরের স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত মার্কিন মূল কোম্পানির জন্য সেবা প্রদানকারী হিসেবে পরিচালিত হয়। ফলে তাদের মুনাফা সীমিত দেখানো হয় এবং করের পরিমাণও কম থাকে।
২০২৫ সালে কোম্পানিটির ২৬ শতাংশ রাজস্ব যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে এলেও, বিদেশে দেখানো হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ করপূর্ব মুনাফা। বিপরীতে ৯৬ শতাংশ মুনাফা যুক্তরাষ্ট্রে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে কর-সুবিধার কারণে ফেডারেল আয়কর শূন্যে নেমে আসে।
সরকারি চুক্তির গুরুত্ব
সিআইসিটিএআর-এর মতে, প্যালান্টিরের কর-ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোম্পানিটির দ্রুত প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে সরকারি চুক্তি থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানটির সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বহু বিলিয়ন ডলারের চুক্তি রয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি, বর্তমানে প্যালান্টিরের মোট রাজস্বের অর্ধেকেরও বেশি আসে সরকারি গ্রাহকদের কাছ থেকে।
যুক্তরাজ্যে কোম্পানিটির কমপক্ষে ৬৭০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের সরকারি চুক্তি রয়েছে, যার মধ্যে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা (এনএইচএস)-এর ৩৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের ডেটা প্ল্যাটফর্ম প্রকল্প এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি চুক্তি উল্লেখযোগ্য।
এই চুক্তিগুলো নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও ডিজিটাল অধিকার সংগঠনগুলোর প্রশ্ন, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে সংবেদনশীল নাগরিক তথ্য তুলে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, যার প্রযুক্তি গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সিআইসিটিএআর বলেছে, “প্যালান্টির করপোরেট আয়কর এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে মনে হয়- যে কর রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি এবং যেসব সরকারি সেবা সরবরাহের জন্য কোম্পানিটি নিজেই চুক্তি পাচ্ছে, সেগুলোর অর্থায়নও মূলত এই কর থেকেই আসে। ”
যুক্তরাজ্যের গুড ল প্রজেক্ট-এর প্রযুক্তি ও তথ্যবিষয়ক প্রধান ডানকান ম্যাকক্যান কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, “এটি সাধারণ করদাতা ও স্থানীয় ব্যবসার প্রতি এক ধরনের চপেটাঘাত, যারা নিয়ম মেনে কর পরিশোধ করে। ”
তিনি বলেন, “বহুজাতিক প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো যদি যুক্তরাজ্যের বাজার থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করেও হিসাবের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে করপোরেট দায় এড়িয়ে যায়, তবে তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ”
এদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্য সরকারকে প্যালান্টিরের সঙ্গে থাকা সরকারি চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে অবদান রাখছে না- এটি প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি সংস্থাগুলোর উচিত এর কাছ থেকে পণ্য ও সেবা ক্রয় বন্ধ রাখা।
সূত্র: আল-জাজিরা
Shamiur Rahman
