রূপালী লাইফের দুর্নীতি: ২৮ কোটি ভুয়া আয়, ৩২ কোটি গোপন ব্যয়

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০২৬ ০১:১৯ পিএম

ধারাবাহিক অনিয়মের চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ বীমা গ্রাহকদের, যাদের ভবিষ্যৎ পলিসির বোনাস ও জমাকৃত টাকা এখন চরম ঝুঁকির মুখে

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও নীতিহীনতার ব্যাপ্তি কেবল অস্তিত্বহীন সম্পদ দেখানো বা ব্যাংক তহবিল গায়েবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কোম্পানিটির জালিয়াতির জাল আরও গভীরে বিস্তৃত, যার মধ্যে রয়েছে- নবায়ন প্রিমিয়ামের হিসাবে ভয়াবহ কারচুপি, দেশের প্রচলিত বীমা আইন সম্পূর্ণরূপে লঙ্ঘন করে কোটি কোটি টাকার ব্যবস্থাপনা ব্যয় গোপন করা এবং দেউলিয়া ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রভিশন ছাড়াই গ্রাহকের আমানতের টাকা লগ্নি করা। এই ধারাবাহিক অনিয়মের চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ বীমা গ্রাহকদের, যাদের ভবিষ্যৎ পলিসির বোনাস ও জমাকৃত টাকা এখন চরম ঝুঁকির মুখে।

বকেয়া ও অনাদায়ী প্রিমিয়ামকে ‘আয়’ দেখিয়ে লভ্যাংশ পকেটে

বীমা খাতের নিয়ম অনুযায়ী, লাইফ বিমা কোম্পানিগুলো ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে তাদের অর্থবছর ধরে আয়-ব্যয়ের হিসাব করে। তবে সমাপনী হিসাবের সুবিধার্থে জানুয়ারি মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত সময়কে অনুগ্রহকাল ধরে এই সময়ে আদায়কৃত নবায়ন প্রিমিয়ামকে ‘আউটস্ট্যান্ডিং প্রিমিয়াম’বা সম্ভাব্য আয় হিসেবে বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখানোর সুযোগ রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে ডিসেম্বর মাসের সমাপনী হিসাবের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।

২০২৪ সালে রূপালী লাইফ মোট নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ দেখায় ১৪৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মধ্যে মোট ৭৪ কোটি ১৯ লাখ টাকাই দেখানো হয়েছে ‘আউটস্ট্যান্ডিং প্রিমিয়া’ হিসেবে, যা তাদের মোট নবায়ন প্রিমিয়ামের ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ, কোম্পানিটি দাবি করেছে যে তাদের মোট প্রিমিয়ামের অর্ধেকেরও বেশি টাকা আসবে কেবল জানুয়ারি মাসের অনুগ্রহকালে।

এই অস্বাভাবিক দাবির চরম অসাড়তা প্রমাণিত হয়েছে বছর শেষে প্রিমিয়াম আদায়ের বাস্তব চিত্রে। এই আউটস্ট্যান্ডিং দেখানো ৭৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে আদায় হয়েছে মাত্র ৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা (৬২%)। বাকি ২৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা কখনোই আদায় বা কোম্পানির তহবিলে জমা হয়নি।

কিন্তু রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ এই অনাদায়ী ও অস্তিত্বহীন ২৭ কোটি ৯১ লাখ টাকাকেই বৈধ আয় হিসেবে গণ্য করে তাদের লাইফ ফান্ড ও সারপ্লাসের হিসাব চূড়ান্ত করেছে। গড়ে ১০ শতাংশ নবায়ন কমিশন বাদ দিয়ে হিসাব চ, এ অনাদায়ী টাকা বাদ দিলে কোম্পানির ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্তের পরিবর্তে উল্টো ৩ কোটি টাকা প্রকৃত ঘাটতি থাকে। কিন্তু রূপালী লাইফের পরিচালকেরা এ ভুয়া আয়ের ওপর ভিত্তি করে ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ পকেটে পুরেছেন।

আইন লঙ্ঘন: ৩২ কোটি টাকার ব্যবস্থাপনা ব্যয় সম্পূর্ণ গোপন

বিমা খাতের সুশাসন ও খরচের লাগাম টানতে প্রণীত বিমা আইন ২০১০-এর ৬২(২) ধারায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসাব করার সময় মূলধনজনিত ব্যয়ের যথার্থ অংশ অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই মূলধনজনিত ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে স্থায়ী সম্পদের অবচয়, ফেয়ার ভ্যালু সমন্বয় এবং শেয়ার কেনাবেচা সংক্রান্ত বিভিন্ন লোকসান। রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এই আইনি বাধ্যবাধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মূলধনজনিত ব্যয় পুরোপুরি বাদ দিয়ে তাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাব তৈরি করেছে। এতে ব্যয়ের প্রকৃত ভয়াবহ চিত্র আড়াল করা হয়।

২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছরে রূপালী লাইফ তাদের মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়েছে ৭৭৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। কিন্তু যদি আইনের নিয়ম মেনে মূলধনায়িত ব্যয় যুক্ত করে প্রকৃত ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসাব করা হতো, তবে এই ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াত ৮০৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, সুকৌশলে আইনি নিয়ম লঙ্ঘন করে কোম্পানিটি তাদের ৩২ কোটি টাকার ব্যবস্থাপনা ব্যয় গোপন করেছে।

শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই কোম্পানিটি ৩ কোটি ২২ লাখ টাকার মূলধনজনিত ব্যয় হিসাবের বাইরে রেখে বেআইনিভাবে দেখিয়েছে যে, তারা ওই বছর সরকার অনুমোদিত খরচের সীমার চেয়ে ৪৮ লাখ টাকা কম ব্যয় করেছে। এর মাধ্যমে কোম্পানিটির অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত খরচের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন করা হয়েছে।

দেউলিয়া প্রতিষ্ঠান ও দুর্বল ব্যাংকে ঝুঁকিপূর্ণ লগ্নি

গ্রাহকদের আমানতের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক হিসাব মান-আইএএস-৯ অনুযায়ী, কোনো বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়লে বা আদায়ের অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তার বিপরীতে বাধ্যতামূলকভাবে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু রূপালী লাইফ দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সংকট ও দেউলিয়াত্বের ঝুঁকিতে থাকা ৪টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং ৪টি চরম দুর্বল ব্যাংকে ৮ কোটি ৫১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে রেখেছে। এ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ডুবন্ত বিনিয়োগের সম্পূর্ণ বিবরণী নিচের ব্যানার চিত্রে প্রকাশ করা হলো।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যেই ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এবং পিপলস লিজিং বন্ধ করে দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে প্রতিষ্ঠান দুটিতে রূপালী লাইফের ২ কোটি ৬০ লাখ ২৪ হাজার টাকা আটকে আছে। প্রতিষ্ঠান দুটি বন্ধ হলে কোম্পানিটি সর্বোচ্চ মাত্র ২০ লাখ টাকা ফেরত পেতে পারে, অর্থাৎ বাকি ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা সম্পূর্ণ ডুবে গেছে।

এছাড়া মাঠকর্মী ও কর্মকর্তাদের কাছে বকেয়া বা সমন্বয়হীন রয়েছে ২৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। অগ্রিম বেতন-ভাতা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ক্রয়ের নামে দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া থাকলেও তা উদ্ধারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

রিনিউয়াল এক্সপেন্স রেশিওতে তথ্য গোপন ও অবক্ষয়ের লাইফ ফান্ড

কোম্পানিটি তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ ব্যয়ের হার বাস্তবের তুলনায় অনেক কম দেখিয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নবায়ন খরচ দেখানো হয়েছে গড়ে ৭.০৪ শতাংশ (সর্বনিন্ম ৬.০৮ থেকে সর্বোচ্চ ১০.২২ শতাংশ)। অথচ প্রকৃতপক্ষে নবায়ন প্রিমিয়ামের জন্য ব্যয়ের প্রকৃত হার গড়ে ১৪.৯০ শতাংশ (সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ)। এই ব্যয়ের হার গড়ে ৭.৮৫ শতাংশ কম দেখিয়ে আর্থিক বিবরণীতে জালিয়াতি করা হয়েছে।

একইভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ৮ বছরে কোম্পানিটি মোট ৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা নিট লোকসান করেছে। এই বিশাল ক্ষতি আড়াল করতে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য খাতের ডিভিডেন্ডের সঙ্গে তা সুকৌশলে সমন্বয় করে আর্থিক প্রতিবেদনে লোকসান গোপন করা হয়েছে।

এই ধারাবাহিক লুটপাট, ভুয়া হিসাব এবং অদক্ষ বিনিয়োগের চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের। ২০২২ সালের পর থেকে রূপালী লাইফের লাইফ ফান্ড ক্রমাগত কমছে, অথচ গ্রাহকদের প্রতি কোম্পানির আর্থিক দায় বেড়েই চলেছে। ২০২২ সালে যেখানে কোম্পানির মোট লাইফ ফান্ড ছিল ৫০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকায়। গত দুই বছরে কোম্পানির মোট বিনিয়োগ ২৮৫ কোটি ৩ লাখ টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের চেয়ে ২৪ কোটি ৯ লাখ টাকা (৭.৭৯%) সংকুচিত হয়েছে।

তহবিল এভাবে ধসে পড়ার কারণে রূপালী লাইফ তাদের পলিসি বোনাসের হার প্রতি হাজার টাকায় ৫৫ টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র ৪৫ টাকায় এনেছে। যথাযথ তদারকি ও কঠোর আইনি শাস্তির ব্যবস্থা না করা হলে সাধারণ বিমা গ্রাহকদের এ কষ্টার্জিত আমানত অচিরেই কর্পূরের মতো উবে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

এই বিষয়ে জানতে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পর্কে জানতে ফোন, বার্তা ও অন্যান্য মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোম্পানির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব হয়নি।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত