শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্টে সিনিয়র উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষোভ

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০২৬ ০৪:১৭ পিএম

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. জিয়াউদ্দিন হায়দারের ছোট ভাই অধ্যাপক ডা. খালিদ মাহমুদ শাকিলকে শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্টের স্বতন্ত্র সিনিয়র উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে

শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্টের স্বতন্ত্র সিনিয়র উপদেষ্টা পদে নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানজুড়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, ট্রাস্টের নীতিমালা অনুসরণ না করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলেছেন ট্রাস্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা।

দ্য ফিন্যান্স টুডে-এর অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. খালিদ মাহমুদ শাকিলকে শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্টের স্বতন্ত্র সিনিয়র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নিয়োগপত্র জারি করেন ট্রাস্টের চেয়ারম্যান তমাল মনসুর, যিনি সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের পুত্র।

এই নিয়োগকে ঘিরে ট্রাস্টের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা দাবি করেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং ট্রাস্টের প্রচলিত রীতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও সংশয় রয়েছে।

তাদের অভিযোগ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. জিয়াউদ্দিন হায়দারের ছোট ভাই অধ্যাপক ডা. খালিদ মাহমুদ শাকিলকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অনেকেই। তবে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস

শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের নাম পরিবর্তনের ইতিহাসও আলোচনায় এসেছে।

জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক, সাবেক শিক্ষার্থী এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসাসেবা দিতে মিরপুরে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের জমিতে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পর এর নাম পরিবর্তন করে উম্মাহ মেডিকেল রাখা হয়।

১৯৯৫ সালে মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু হলে এর নাম হয় উম্মাহ মেডিকেল কলেজ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিষ্ঠানটি উত্তরায় স্থানান্তরিত হয়। সে সময় তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের উদ্যোগে তাঁর বাবা জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর নামে কলেজটির নামকরণ করা হয শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ।

পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে মওলানা ভাসানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল রাখা হয়। আবার ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কলেজটির নাম পুনরায় শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ করা হয়।

প্রতি বছর কোটি টাকার আয়

বর্তমানে একটি ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত এই মেডিকেল কলেজে প্রতি বছর প্রায় ১৪০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শুধুমাত্র ভর্তি কার্যক্রম থেকেই প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

এদিকে সাম্প্রতিক সিনিয়র উপদেষ্টা নিয়োগকে কেন্দ্র করে ট্রাস্টের অভ্যন্তরে যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

এই নিয়োগ এবং উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে ট্রাস্টের চেয়ারম্যান তমাল মনসুর এবং উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মো. খালিদ মাহমুদ শাকিলের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত