গাজীপুরে রিসোর্ট ও কুমিল্লায় হোটেলে অভিযান; ৬,৬০০ এমএফএস অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিম জব্দ
ডিবির বিশেষ অভিযানে অনলাইন জুয়াচক্রের ৬ সদস্য গ্রেফতার
এসময় তাদের কাছ থেকে ৬,৬০০টি মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, ৭০টির অধিক মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের বিশেষ অভিযানে সংঘবদ্ধ অনলাইন জুয়ার সাইট পরিচালনাকারী একটি চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃত ৬ সদস্যরা হলো, মোঃ আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), মোঃ আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আব্দুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) এবং মশিউর রহমান তারেক (২০)।
এসময় তাদের কাছ থেকে ৬,৬০০টি মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, ৭০টির অধিক মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়।
ডিএমপির মিডিয়া সেন্টার সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ডিবি অনলাইনে পরিচালিত একাধিক জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব জুয়ার প্ল্যাটফর্মে লেনদেন পরিচালনার জন্য মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে।
নিবিড় অনুসন্ধান এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত একটি রিসোর্টে অভিযান পরিচালনা করে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতায় কুমিল্লা সদরের একটি হোটেলে অভিযান পরিচালনা করে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস পরিচালনার কাজে অনেকগুলো পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে থাকে। উল্লেখযোগ্য কিছু পেমেন্ট কোম্পানি হল Pay Kashma, Gopay, Lucky pay, LQ pay, XE pay, Cool pay প্রভৃতি। বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে যেসব পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে তার অধিকাংশই চাইনিজ নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এসব পেমেন্ট কোম্পানির বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য স্থানীয় প্রচলিত লেনদেনের মাধ্যম প্রয়োজন হয়। যার দরুণ তারা অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশীদের কাছ থেকে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। ব্যাংকের তুলনায় সহজলভ্য এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পেমেন্ট কোম্পানি এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকে।
জুয়ার সাইট এবং অ্যাপস পরিচালনার জন্য সাধারণত এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। এসব এজেন্ট অ্যাকাউন্টে হওয়া লেনদেন দিনশেষে হিসাব করে প্রাপ্ত লভ্যাংশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস পারসোনাল অ্যাকাউন্টে প্রেরণ করা হয়। উক্ত পারসোনাল অ্যাকাউণ্ট সমূহে প্রেরিত অর্থ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম (বাইন্যান্স, বাইবিট, বিটগেট প্রভৃতি) ব্যবহার করে ক্রিপ্টো ডলার (ইউএসডিটি) ক্রয় করা হয়। পরবর্তীতে পেমেন্ট কোম্পানির প্রেরিত ওয়ালেট অ্যাড্রেসে উক্ত ক্রিপ্টো ডলার প্রেরণ করা হয়।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার সাইট ও অ্যাপসসমূহের পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০টির মত পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে থাকে। এসব পেমেন্ট কোম্পানির দৈনিক লেনদেন কয়েক কোটি টাকার উপরে।
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত আসামিরা Gopay পেমেন্ট কোম্পানির হয়ে কাজ করত এবং তাদের দৈনিক লেনদেন ৫ কোটি টাকার উপরে। Gopay কোম্পানিটি চাইনিজ নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। গ্রেফতারকৃত আসামি চাইনিজ নাগরিক নাথান ওরফে অ্যালিনের (ছদ্মনাম) এজেন্ট হয়ে বাংলাদেশে কাজ করে। উক্ত চাইনিজ নাগরিকরা একসময় বাংলাদেশে অবস্থান করত; বর্তমানে তারা চায়না থেকেই আলোচিত এই কোম্পানিটি পরিচালনা করে থাকে।
প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার ওয়েবসাইট সমূহে এমএফএস অ্যাকাউণ্ট সমূহের মাধ্যমে দৈনিক ১,০০০ কোটি টাকার উপরে লেনদেন সংঘটিত হয়ে থাকে। উক্ত লেনদেন থেকে প্রাপ্ত গ্রস প্রফিট পেমেন্ট কোম্পানিগুলো ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডলারে কনভার্ট করে ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ভাল পেমেন্ট কোম্পানিগুলোর প্রতিটি দৈনিক ১,০০,০০০ (এক লাখ) ইউএসডিটি ডলারের উপরে পাচার করে থাকে। পেমেন্ট কোম্পানির প্রাপ্ত কাজ বাংলাদেশিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে করে। একটি অংশ এমএফএস অ্যাকাউন্ট সরবরাহ করে, অপর অংশ লভ্যাংশের বাংলাদেশি টাকা ক্রিপ্টো ডলারে কনভার্ট করে থাকে।
সংঘবদ্ধ এই চক্রটির বাংলাদেশ অংশের মূলহোতা গ্রেফতারকৃত আসামি আরিফুল ইসলাম রিফাত। তার অধীনেই বাকিরা উক্ত Gopay নামক কোম্পানির হয়ে কাজ করে থাকে। আরিফের তথ্যমতে, পেমেন্ট কোম্পানিগুলো দৈনিক মোট লেনদেনের ০.২- ১ শতাংশ টাকা তাদেরকে প্রদান করে থাকত। প্রাপ্ত টাকার ৫০ শতাংশ টাকা সে তার ভেন্ডরদের প্রদান করে থাকে। উক্ত টাকার ভাগের অংশ ভেন্ডর অর্থাৎ এমএফএস অ্যাকাউণ্টের এজেন্ট, ডিএসও, সুপারভাইজার ক্ষেত্র বিশেষে হাউস ম্যানেজার, মালিক এবং এমএফএস কর্তৃপক্ষের লোকজনও পেয়ে থাকে বলে জানা যায়।
উল্লেখ্য, এই টাকার বাইরে উক্ত কাজে জড়িতদের জীবনযাত্রা সংক্রান্ত অন্যান্য সকল খরচ (আবাসন, খাবার, যাতায়াত প্রভৃতি) উক্ত কোম্পানি বহন করে থাকে।
ডিবির একটি সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে ৩০০ ফিটে একটি বিএমডব্লিঊ গাড়ি দুর্ঘটনায় কবলিত হয়েছিল। উক্ত গাড়িটির মালিক আরিফ বলে জানা যায়। এটি ছাড়াও তার সাদা রঙের একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি রয়েছে। এই দুটো গাড়ির সূত্র থেকেই তাদের মাসিক আয় সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
উক্ত গাড়িগুলো উদ্ধার এবং ক্রাইমের সাথে জড়িত অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারের জন্য বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন ডিবির উর্ধতন একাধিক কর্মকর্তা।
এদিকে, গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন তারা।
Shamiur Rahman
