বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ

১০৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ জাদিদ অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬ ০৪:৩৪ পিএম

যদিও অভিযোগের শুরুতে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, তদন্ত শেষে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য নিশ্চিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চট্টগ্রামের জাদিদ অ্যাপারেলস লিমিটেডের বন্ড লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড কমিশনারেট। তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত আমদানি করা কাপড় অবৈধভাবে খোলা বাজারে বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ১০৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যদিও অভিযোগের শুরুতে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, তদন্ত শেষে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য নিশ্চিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালে জাদিদ অ্যাপারেলসের আমদানি, রপ্তানি কার্যক্রম, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বন্ড সুবিধার ব্যবহার সরেজমিনে যাচাই করে চট্টগ্রাম কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড কমিশনারেট। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বন্ড লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক রপ্তানির শর্তে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাপড় আমদানি করা হলেও সেই কাপড়ের একটি অংশ নিয়মবহির্ভূতভাবে বন্ড গুদাম থেকে সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার শুল্ক ও কর বাবদ প্রায় ১০৮ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাদিদ অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মোজাম্মেল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বা প্রতিষ্ঠানের কোন বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, "বন্ড সুবিধা নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রতারণার সুযোগ থাকা উচিত নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো শিল্পখাত এবং প্রকৃত উদ্যোক্তারা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছেন।"

এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "এই ধরনের রাজস্ব ফাঁকি এককভাবে সংঘটিত হওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। এর সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে, সে জন্য কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।"

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিদ্যমান আইনে ফাঁকি দেওয়া অর্থের দ্বিগুণ পর্যন্ত জরিমানা, বন্ড লাইসেন্স বাতিল, বকেয়া শুল্ক-কর আদায়সহ অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

রাজস্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ড সুবিধা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা হলেও এর অপব্যবহার সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ক্ষতির পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্যও অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে। তাই বন্ড ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত