আ.লীগের প্রভাবশালী ভূমি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান খুটি গেড়েছে সাভারে
জুলাই অভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন
ঢাকার সাভারের আমিনবাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাব এখনো বহাল রেখেছেন। তিনি ভেতরে ভেতরে চালিয়ে যাচ্ছেন দলীয় কর্মকাণ্ড। তবে প্রকাশ্যে বিএনপি পন্থী অফিসার বুনে গেছেন। নিজেকে চালাক ভাবা এই ভূমি কর্মকর্তা ঠেকেন না কোথাও। তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে জনসভা, সমাবেশ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাকে নিয়মিত দেখা যেত। বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর সঙ্গে তার তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি সেসব ছবি সংবলিত পোস্টারও বিভিন্ন এলাকায় টানানো হয়। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বর্তমানে মনিরুজ্জামান আমিনবাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নায়েব হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ঢাকা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ গ্রহণ, দালালচক্রের মাধ্যমে ভূমিসেবা নিয়ন্ত্রণ, নামজারিতে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে গত মাসে স্থানীয় চার বাসিন্দা ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, একের পর এক অভিযোগ উঠলেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের ভাষ্য, ক্ষমতার পালাবদলের প্রায় দুই বছর পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মনিরুজ্জামান বলেন, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ছবি ও অভিযোগ নিয়ে তিনি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ঢাকার ডেমরা এলাকার বাসিন্দা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি বদলি হয়ে সাভারের আমিনবাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগ দেন। বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতির নেতা হওয়ায় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেই তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। আমিনবাজারে যোগদানের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে ঘুষ, দালালচক্রের মাধ্যমে ভূমিসেবা নিয়ন্ত্রণ, জমি-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে সাধারণ মানুষের জমি জবরদখলে সহায়তার অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায়ও তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। বিশেষ করে ঢাকা-৫ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর নির্বাচনী প্রচারণায় ডেমরা, ধীৎপুর ও খলাপাড়া এলাকায় তাকে সক্রিয়ভাবে দেখা গেছে। এছাড়া সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতির গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন। একই প্রভাব ব্যবহার করে ভূমি অফিসে আধিপত্য বিস্তার করতেন এবং বিএনপি মতাদর্শী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপে রাখতেন।
একাধিক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মনিরুজ্জামান নিজেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেন। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে পুলিশ ও দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে হয়রানি করতেন। তাদের দাবি, অফিস চলাকালেও তিনি জনসেবার চেয়ে রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাব বিস্তারেই বেশি মনোযোগী ছিলেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মনিরুজ্জামানের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং তিনি আমিনবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি হয়ে এসে আগের মতোই প্রভাব বিস্তার করছেন এবং নতুন করে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শুধু তাই নয়, বিভিন্ন মহলে তিনি দাবি করে বেড়ান, ভূমিখেকোদের রোষানলে পড়ায় বদলির চেষ্টা করলেও জেলা প্রশাসক তাকে আমিনবাজার থেকে সরাতে চান না। যদিও স্থানীয়রা বলছেন ভিন্ন কথা, বদলি ঠেকাতে এই বিতর্কিত ভূমি কর্মকর্তা নিজেকে বিএনপির সমর্থক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন।
মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ডিসির কাছে লিখিত অভিযোগ
আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেলের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দালালচক্র পরিচালনার অভিযোগ এনে ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে লিখিত আবেদন করেছেন স্থানীয় চার বাসিন্দা। অভিযোগে তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার, বিভাগীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
গত মাসে জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেল ভূমি অফিসে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ভূমিসেবা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। নামজারি, খতিয়ানসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি এবং অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, অফিসে নিয়মবহির্ভূত সময় পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনা, দালালদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়মের কারণে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে বদলির দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারীরা বলেন, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি লিখিত অভিযোগের বিষয়ে কিছু জানি না। ভালো কাজ করায় আমার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সংগঠন করায় আমি অনেকের রোষানলে পড়েছি।
সরকারি কর্মকর্তা হয়েও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার
অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন ছবি, ভিডিও এবং স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা হয়েও মনিরুজ্জামান ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার পক্ষে প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের একজন ডোনার হিসেবেও তার নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে কীভাবে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং আমিনবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে প্রভাব বজায় রেখেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, সরকারি চাকরিতে থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মনিরুজ্জামানকে নিয়ে পোস্টার সাঁটানো হয়। পোস্টারগুলোতে তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ ও ‘ঢাকা জেলা ভূমি অফিসের অঘোষিত মাফিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করা হয়।
পোস্টারে সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক এমপি কাজী মনোয়ারুল ইসলাম (মনু), সাবেক এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তার তোলা ছবি স্থান পায়। এছাড়া ২০২৪ সালের নির্বাচনে নৌকার পক্ষে প্রচারণা, নিজ অর্থায়নে নির্বাচনী ক্যাম্প পরিচালনা, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং গুলিস্তানে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে তোলা ছবিও প্রকাশ করা হয়।পোস্টারে দাবি করা হয়, এসব ছবি তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ বহন করে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত ১৬ জুলাই মনিরুজ্জামানের কার্যালয়ে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদক। এ সময় পোস্টারে প্রকাশিত এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে তার তোলা বিভিন্ন ছবি দেখানো হলে তিনি প্রথমে সেগুলো নিজের নয় বলে দাবি করেন। পরে তিনি বলেন, 'এটা আমার মতোই দেখা যাচ্ছে। এখন কেউ তৈরি করেছে কি না, কিংবা ছবিগুলো কবে তোলা সেটা আমি বলতে পারব না। এগুলো অনেক আগের বিষয়। তবে সরকারি কাজের ক্ষেত্রে ছবি থাকতে পারে, আমি আওয়ামী লীগের দোসর-এটা প্রমাণ করার জন্য পোস্টারিং করা হয়েছিল। কিন্তু এগুলো আমি কি না, সেটা এখন নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।'
কী বলছেন বিএনপি নেতারা?
সাভারের বনগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হাজী আবু সাঈদ বলেন, আমিনবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন একজন আওয়ামী লীগের দোসর কর্মরত আছেন- এ বিষয়টি আমার জানা ছিল না। বিষয়টি দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের জানাব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমিও বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।
সাভার থানা বিএনপির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি কখনো ভূমি অফিসে যাই না। এ বিষয়ে আগে কিছু জানতাম না। আপনার মাধ্যমে জানলাম। এই ধরনের যদি কোনো আওয়ামী লীগের দোষর থাকে, তার এখানে থাকার কোনো জায়গা নেই।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনাদের মাধ্যমে অভিযোগগুলো সম্পর্কে জানতে পারলাম। যাচাই-বাছাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা জেলা প্রশাসক মিজ্ ফরিদা খানম এবং বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোতাহার হোসেন খানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Shamiur Rahman
