২৬৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে নতুন বিতর্ক; ৬ বছর পার হলেও শেষ হয়নি কাজ
বরিশাল নভোথিয়েটারে বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই ১৩ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার
২০২৪ সালে ভবনে এসি সরবরাহ ও স্থাপনের দরপত্র পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'এয়ারকন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’। ২০২৫ সালে তারা ভবনে এসি বসালেও, তা সচল না করেই ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তুলে নেয় ১৩ কোটি ১২ লাখ ৬০হাজার ৭৫৩ টাকার পুরো বিল
বরিশাল নভোথিয়েটারে বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই ১৩ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার
২৬৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে নতুন বিতর্ক; ৬ বছর পার হলেও শেষ হয়নি কাজ
দক্ষিণাঞ্চলের বিজ্ঞানভিত্তিক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বরিশাল নভোথিয়েটার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। দুই দফা সময় বৃদ্ধি এবং ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার পরও প্রকল্পটি কবে নাগাদ চালু হবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রকল্পের কাজ ছয় বছর পেরিয়ে ঠেকেছে ৭০ থেকে ৮০শতাংশে। তবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই মেগা প্রকল্পটিতে জেঁকে বসেছে অনিয়ম।
পুরো ভবনে এখনো দেয়া হয়নি বিদ্যুৎ সংযোগ, অথচ এসির ডাক্টিং লাইন আর মেশিন বসিয়ে কোনো ধরনের টেস্টিং ও কমিশনিং ছাড়াই পুরো ১৩ কোটি টাকার বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ উঠেছে, নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই বিল উত্তোলনের কাজে সহযোগিতা ও সন্তোষজনক কাজের সনদ দিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর । সরেজমিনে দেখা গেছে, সুবিশাল ভবনের ছাদের সিলিংয়ে স্থাপন করা হয়েছে এসির ডাক্টিং লাইন, বসানো হয়েছে এসির মেশিন। আপাতদৃষ্টিতে কাজ সম্পন্ন মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ভবনটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এসি সচল হওয়াতো দূরের কথা, তা সচল আছে কিনা তাও পরীক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
গণপূর্ত বরিশাল কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভবনে এসি সরবরাহ ও স্থাপনের দরপত্র পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'এয়ারকন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’। ২০২৫ সালে তারা ভবনে এসি বসালেও, তা সচল না করেই ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তুলে নেয় ১৩ কোটি ১২ লাখ ৬০হাজার ৭৫৩ টাকার পুরো বিল। গণপূর্তের তথ্য মতে, ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের কাজ ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ২০ শতাংশ কাজ বাকি রয়ে গেছে।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়া এবং যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা পরীক্ষা (টেস্টিং ও কমিশনিং) না করে পুরো বিল তুলে নেয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। এটি সরকারি অর্থের সুস্পষ্ট অপচয় এবং বড় ধরনের অনিয়ম। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গভীরভাবে তদন্ত করে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এই ব্যাপারে এয়ারকন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা মিডিয়া কর্মীদের সাথে কোন ধরনের কথা বলতে রাজি হননি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সর্বশেষ সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি সে লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে।গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্নের দাবি করা হলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ভবনের কাঠামো দৃশ্যমান হলেও প্রকল্পের মূল প্রযুক্তিগত অংশ এখনো অসম্পূর্ণ। বিশেষ করে ডোম, টেলিস্কোপ, ডিজিটাল প্রজেকশন ও অন্যান্য ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সরঞ্জাম স্থাপন বাকি রয়েছে। এসব যন্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাদের মতে, প্রকল্প পুরোপুরি চালু হতে আরও দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন গণপূর্ত বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম। তিনি বলেন, “কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভূমি প্রস্তুত ও সাইট ডেভেলপমেন্টে দীর্ঘ সময় লেগেছে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ কাজ প্রায় শেষ এবং বাইরের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। আমরা আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।”
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে প্রকল্পটি ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার’ নামে অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘বরিশাল নভোথিয়েটার’ রাখা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে কন্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এবং ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।
বরিশাল সদর উপজেলার কীর্তনখোলা নদীর তীরে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন প্রায় ১০ একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে এ নভোথিয়েটার। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১২ কোটি টাকা, যা পরবর্তীতে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা বেড়ে বর্তমান ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৬০ কোটি টাকায়।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, এখানে থাকবে দুটি ডোমসহ মোট ২৬টি স্থাপনা। এর মধ্যে আধুনিক প্ল্যানেটরিয়াম, অডিটোরিয়াম, ডিজিটাল এক্সিবিশন গ্যালারি, ডরমেটরি ও প্লাজা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ৩০৪ আসনের গ্যালারি, ১৭৫ আসনের অডিটোরিয়াম, ১৭৫টি গাড়ির পার্কিং সুবিধা এবং শিশুদের জন্য আলাদা বিনোদন জোন গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলী ইব্রাহীম হোসাইন বলেন, নভোথিয়েটারটি চালু হলে মহাকাশবিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও বিনোদনের একটি আধুনিক কেন্দ্র তৈরি হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য এটি হবে আকর্ষণীয় শিক্ষামূলক স্থান।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই প্রকল্প চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখতে পারবে, যা বিজ্ঞান শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
তবে বারবার সময় বৃদ্ধি ও ব্যয় বাড়ার ঘটনায় এমনিতেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও বিতর্ক বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Shamiur Rahman
