২৪ ঘন্টার মাথায় বদলির আদেশে পরিবর্তন; নিয়মবহির্ভূত পদায়ন ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলমান

বিতর্কিত রেশমা খাতুনকে চুয়াডাঙ্গা থেকে যশোরের চৌগাছায় ফের বদলি

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ ০২:১৪ পিএম

২২ জুলাই (বুধবার) পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (পার্সোনেল) এরশাদ আহমেদ নোমানী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর একদিন আগে অর্থাৎ ২১ জুলাই (মঙ্গলবার) রেশমা খাতুনকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে বদলির আদেশ জারি করা হয়েছিলো

দীর্ঘদিনের বিতর্ক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তোষ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে মাগুরার সদর উপজেলার বিতর্কিত সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোছা. রেশমা খাতুনকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বদলি করে জারিকৃত আদেশ বাতিল করে যশোরের চৌগাছা উপজেলায় সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে নতুন করে বদলি করা হয়েছে।

২২ জুলাই (বুধবার) পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (পার্সোনেল) এরশাদ আহমেদ নোমানী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর একদিন আগে অর্থাৎ ২১ জুলাই (মঙ্গলবার) রেশমা খাতুনকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে বদলির আদেশ জারি করা হয়েছিলো। 

অফিস আদেশ অনুযায়ী, রেশমা খাতুনের মূল পদ পরিবার পরিকল্পনা সহকারী। তিনি দীর্ঘদিন মাগুরার সদর উপজেলায় সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নতুন আদেশে তাকে একই মূল পদে যশোরের চৌগাছা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, আদেশ জারির তারিখ থেকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে এবং নির্ধারিত কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে।

যদিও দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রশাসনিক প্রয়োজনেই এই বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে। তবে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র গভীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রেশমা খাতুনের পদায়ন ও বদলিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাগুরার শালিখা উপজেলায় পরিবার পরিকল্পনা সহকারী (তৃতীয় শ্রেণি) পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে মাগুরা সদর উপজেলায় দ্বিতীয় শ্রেণির পদ সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই পদায়ন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত নীতিমালা ও পদায়ন বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

এই ঘটনায় 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'তে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। পরবর্তীতে, বিষয়টি আমলে নিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর রেশমা খাতুনের পদায়ন-সংক্রান্ত বিষয় তদন্তের উদ্যোগ নেয়।

সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোছা: রেশমা খাতুনকে ঘিরে বিতর্কের মূল কারণ নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতি, গুরুতর প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা। মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি দুর্নীতিচক্রের সাথে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ায় এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। রেশমা খাতুনকে ঘিরে তৈরি হওয়া মূল বিতর্কগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো।

নিয়মবহির্ভূত পদায়ন

রেশমা খাতুনের মূল পদ হলো 'পরিবার পরিকল্পনা সহকারী', যা একটি তৃতীয় শ্রেণীর (১১তম গ্রেড) সাধারণ পদ। পদোন্নতি সংক্রান্ত নীতিমালা লঙ্ঘন করে মাগুরার তৎকালীন উপপরিচালক গাজী বশির আহমেদ কর্তৃক জারিকৃত আদেশে তাঁকে নিয়মবহির্ভূতভাবে মাগুরা সদর উপজেলা কার্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর (১০ম গ্রেড) 'সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা' হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বে পদায়ন করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পদায়ন বিধিমালা এবং জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে এভাবে নিম্ন পদের কর্মচারীকে উচ্চ পদের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে দপ্তরের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

ব্যক্তিগত প্রভাব ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা

'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র গভীর অনুসন্ধানে মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক গাজী বশির আহমেদের সাথে রেশমা খাতুনের ব্যক্তিগত বিশেষ ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি ধরা পড়ে। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সাধারণ নিয়মকানুন অমান্য করতেন। জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়েই নারী সহকর্মীদের নিয়ে নিয়মিত অনিয়মতান্ত্রিক আড্ডা, রান্নাবান্না ও পিকনিকের আয়োজন করা হতো, যা সরকারি দপ্তরের কাজের পরিবেশ ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী ছিল বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

দুর্নীতি ও বদলি-বাণিজ্য সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা

অভিযোগ রয়েছে যে, মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়কে একটি 'ব্যক্তিগত আখড়া'য় পরিণত করা হয়েছিল। রেশমা খাতুন এই চক্রের অন্যতম প্রভাবশালী অংশ ছিলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লাখ টাকার বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত কর্মীদের পোস্টিং দেওয়া, ভুয়া পেশনের আদেশ জারি করা এবং সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে বদলি করার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। তৎকালীন সদর উপজেলা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম একাধিকবার এর প্রতিবাদ করলেও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রভাবে রেশমা খাতুনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এফটি টীমের বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাগুরা সদর উপজেলার টিএফপিএ মিরাজুল ইসলামকে বদলির আদেশ জারি করার এক দিনের মধ্যেই সেই আদেশের কপি ছিঁড়ে ফেলা হয়। পরে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়, ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে ওই বদলির আদেশ বাতিল করা হয়। মিরাজুল ইসলাম স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন সদস্য বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মাগুরা শ্রীপুর উপজেলার টিএফপিএ মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে সপ্তাহে দুই দিন মাগুরা সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসে হিসাব শাখার দায়িত্ব দেওয়ার আদেশ দেন গাজী বশির আহমেদ। তবে অভিযোগ রয়েছে, এক লাখ টাকা নেওয়ার পর সেই আদেশও বাতিল করে দেওয়া হয়।

মাগুরা সদর উপজেলার টিএফপিএ জীবন কুমার বশুকে মোহাম্মদপুর উপজেলায় পেশনে রেখে সদর উপজেলায় মিরাজুল ইসলামকে কার্যত একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাগুরা সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম একাধিকবার জীবন কুমার বশুর পেশনের আদেশ বাতিলের অনুরোধ জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্লেখিত এই তিনটি ঘটনার নেপথ্যেই রেশমা খাতুন মূল অনুঘটক হিসেবে 

বদলি বিতর্ক

কর্মস্থলে অসংখ্য অনিয়ম ও বিতর্কিত ভূমিকার কারণে রেশমা খাতুনকে পূর্ববর্তী কর্মস্থল মাগুরা থেকে বদলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমান এবং মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক গাজী বশির আহমেদ রেশমা খাতুনের ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে বিভিন্ন মহলে তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে বারবার সুবিধাজনক স্থানে বদলি বা বদলি বাতিলের চেষ্টা চালান, যা প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। 

রেশমা খাতুনের সাথে সংশ্লিষ্টতা এবং উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার গাজী বশির আহমেদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমান এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।

ধারাবাহিক অনিয়ম ও বিতর্কের জেরে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তোষ এবং 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'সহ একাধিক গনমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের ফলে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে, সরকারের উচ্চ মহলের তিরষ্কার ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের জেরে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর রেশমা খাতুনকে প্রথমে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বদলি করে। তবে সেখানেও বিতর্ক তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত সেই আদেশ বাতিল করে তাঁকে যশোরের চৌগাছা উপজেলায় নতুন করে বদলি করা হয়।

এদিকে, একাধিক মহল থেকে মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক গাজী বশির আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অসংখ্য অভিযোগ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র গভীর অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত আগামী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত