গণ অভ্যুত্থানে আত্মত্যাগী ছয় সাংবাদিক
গণ অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হলেও তাদের স্বজনদের চোখে এখনো একই প্রশ্ন-কবে হবে সাংবাদিক হত্যার বিচার? কবে মিলবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি? তদন্তের ধীরগতি, বিচার প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা এবং আর্থিকসহ নানা সংকটে দিন কাটছে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারগুলোর
জুলাই গণ অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে যখন চলছিল সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ আর প্রাণ বাঁচানোর যুদ্ধ, তখনো ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও নোটবুক হাতে ঘটনাস্থলে ছিলেন সংবাদকর্মীরা। নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবে তাঁরা মানুষের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে সংগ্রহ করেছেন তথ্য। ধারণ করেছেন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই প্রাণ হারান ছয় সাংবাদিক।
এদিকে, সাংবাদিক হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণ করার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)।
অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক সংগঠন আরএসএফ বলেছে, সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বিচারিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে ধীরগতি দেখিয়েছে।
গণ অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও তাদের স্বজনদের চোখে এখনো একই প্রশ্ন-কবে হবে সাংবাদিক হত্যার বিচার? কবে মিলবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি? তদন্তের ধীরগতি, বিচার প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা এবং আর্থিকসহ নানা সংকটে দিন কাটছে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারগুলোর।
১৮ জুলাই: হাসান মেহেদী ও শাকিল হোসাইন
গণ অভ্যুত্থানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রথম নিহত হন ঢাকা টাইমসের স্টাফ রিপোর্টার হাসান মেহেদী। ১৮ জুলাই বিকালে রাজধানীতে সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। একই দিন উত্তরায় দায়িত্ব পালনকালে গুলিতে নিহত হন দৈনিক ভোরের আওয়াজের প্রতিবেদক শাকিল হোসাইন। একদিনে এই দুই সাংবাদিকের মৃত্যু গণমাধ্যম অঙ্গনে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
স্বামীকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি হাসান মেহেদীর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েরা এখনো তাদের বাবাকে খোঁজে। ছোট মেয়েটা বাবার ছবি বুকে নিয়েই ঘুমায়। হাসান মেহেদীর বাবা প্রবীণ সাংবাদিক এইচ এম মোশাররফ হোসেন এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এরই মধ্যে তিনি একাধিকবার স্ট্রোক করেছেন। ’
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শাকিলের মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি বাবা মো. বেলায়েত হোসেন ও মা রাশেদা বেগম। বৃদ্ধ বাবা বলেন, ‘মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়, মনে হয় শাকিলকে দেখলাম। ওর মাও প্রায়ই ছেলেকে স্বপ্ন দেখে কাঁদতে কাঁদতে জেগে ওঠেন।'
এই হত্যার ঘটনায় উত্তরা-পূর্ব থানায় মামলা করেন বাবা বেলায়েত। তিনি বলেন, মামলার কী অবস্থা, জানি না। পুলিশও কোনো আপডেট দেয় না। একটাই চাওয়া-শেষ বয়সে যেন বিচার দেখে মরতে পারি।
১৯ জুলাই: তাহির জামান প্রিয় ও আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব
১৯ জুলাই সিলেট শহরে সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব। ওই দিনই রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছবি তুলতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়।
প্রিয়র মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি কষ্টের ভার বহন করছে ছয় বছরের মেয়ে পদ্ম। তার দাদি শামসি বলেন, কোনো বাবার কোলে শিশু দেখলে তাকিয়ে থাকে পদ্ম, চোখ ভিজে ওঠে। ক্যামেরা দেখলেই তার বাবার কথা মনে পড়ে। প্রায়ই প্রশ্ন করে-‘আমার বাবা কোথায়?’
মামলার তদন্ত নিয়ে হতাশা জানিয়ে শামসি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। আমি শুধু ন্যায়বিচার দেখতে চাই।'
তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মো. আযরফ বলেন, মা বারবার একটাই প্রশ্ন করেন-আমার ছেলের হত্যার বিচার কি হবে না? তুরাব হত্যার ঘটনায় করা মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন না স্বজনরা। তিনি বলেন, তদন্তের জন্য কর্মকর্তারা এসে তথ্য নিয়েছিলেন। এরপর আর কোনো খবর পাইনি।
৪ আগস্ট: প্রদীপ কুমার ভৌমিক
এরপর ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে গুলিতে নিহত হন দৈনিক খবরপত্রের প্রতিবেদক প্রদীপ কুমার ভৌমিক। পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন প্রদীপ। তাঁর মৃত্যুর পর আর্থিক ও মানসিক সংকটে পরিবারটি। ছোট ছেলে সুজন বাবার পথ অনুসরণ করে সাংবাদিকতা পেশায় এসেছেন। তিনি কালের কণ্ঠের রায়গঞ্জ প্রতিনিধি।
সুজন অভিযোগ করে বলেন, ‘মৃত্যুর পর আমার বাবাকে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ ট্যাগ দেওয়া হয়। অথচ বাবা বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য ও রায়গঞ্জ উপজেলা সেক্রেটারি ছিলেন।' আক্ষেপ করে তিনি বলেন, তিনবার আবেদন করেও স্বীকৃতি মেলেনি।
৫ আগস্ট: সোহেল আখঞ্জি
সর্বশেষ ৫ আগস্ট হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানার সামনে দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল আখঞ্জি। এতদিন পরও এই সাংবাদিকের পরিবার জানে না মামলার তদন্ত কতদূর এগিয়েছে। স্ত্রী মৌসুমি আক্তার তিন সন্তান নিয়ে সংগ্রাম করছেন। সরকারি ও বিভিন্ন উৎস থেকে আর্থিক সহায়তা পেলেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তাঁর পিছু ছাড়ছে না।
সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় ছোট মেয়ের কথা। বাবার মৃত্যুর অর্থ পুরোপুরি বুঝতে না পারা শিশুটি এখনো বিশ্বাস করে, তার বাবা বিদেশে গেছে, একদিন ফিরে আসবে। এভাবেই গণ অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত ইতিহাসে যুক্ত হয় ছয় সংবাদকর্মীর আত্মত্যাগের অধ্যায়।
Shamiur Rahman
