দেড় হাজার ইলেকট্রিক বাস কিনতে তোড়জোড় সরকারের
আগামী ডিসেম্বর থেকেই দেশে ইলেকট্রিক বাস আসা শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন চালুর লক্ষ্যে প্রায় দেড় হাজার ইলেকট্রিক বাস কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এজন্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) পৃথক কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান। তবে আগামী ডিসেম্বর থেকেই দেশে ইলেকট্রিক বাস আসা শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে মোট ২০০টি বাস সরবরাহ করা হবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৪৫ আসনের ১০০টি ইলেকট্রিক বাস, চার্জিং স্টেশন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে ৪০০ কোটি টাকা এবং নারীদের জন্য ২৮ থেকে ৩২ আসনের ১০০টি ইলেকট্রিক মিনিবাস, চার্জিং স্টেশন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে ৪০০ কোটি টাকার দুটি পৃথক প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়। পরে অর্থ বিভাগ অনুদানের পরিবর্তে ৮০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিতে সম্মতি দিয়েছে।
এই বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, মোট ২০০টি ইলেকট্রিক বাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ এই প্রকল্পে ঋণ সহায়তার অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। বাসগুলো পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে এখনও কাজ চলছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ঢাকা মহানগরীকে কেন্দ্র করেই এসব বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। রুট, চার্জিং স্টেশনের অবস্থান এবং পরিচালনা সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় নির্ধারণে একটি কমিটি কাজ করছে।
প্রকল্পসমূহ
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বায়ুদূষণ রোধে বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্টের (বিসিএপি) প্রথম ধাপের আওতায় ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস কেনা হবে। বর্তমানে এই প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধনের কাজ করছে ডিটিসিএ।
নারীবান্ধব গণপরিবহন চালুর অংশ হিসেবে বিআরটিসি ১০০টি ইলেকট্রিক মিনিবাস কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রকল্পে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে সংস্থাটি।
এছাড়া ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) অর্থায়নে ৩০০টি বৈদ্যুতিক এসি বাস এবং ২৫টি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে এনিয়ে প্রাথমিক কাজ চলছে।
চীনা অর্থায়নে আরও ৫০০টি বৈদ্যুতিক এসি বাস এবং ২৫টি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১১ জুন পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় এই প্রকল্পের ব্যয় পুনর্বিবেচনা করে সংশোধিত প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে।
সরকারি অর্থায়নে একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় আরও ১২টি ইলেকট্রিক বাস কেনা, চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিআরটিসি।
সব মিলিয়ে ডিটিসিএ ও বিআরটিসির বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৪১২টি ইলেকট্রিক বাস সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং নগরাঞ্চলে যানবাহনের কার্বন নিঃসরণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশদূষণ রোধ ও বায়ুমান উন্নয়ন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা, সবার জন্য উপযোগী গণপরিবহন সম্প্রসারণ, যানজট হ্রাস, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা করবে।
তবে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বিদ্যমান গণপরিবহনব্যবস্থার যৌক্তিকীকরণ ছাড়া এতগুলো নতুন ইলেকট্রিক বাস চালু করলে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
নগরবাসী বলছেন, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজধানীতে ইলেকট্রিক বাস চালু করার উদ্যোগ ইতিবাচক। পরিবেশ রক্ষায় এটি নিঃসন্দেহে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। তবে পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন লক্করঝক্কর বাসের সঙ্গে ইলেকট্রিক বাসের পাল্লা দিয়ে চলা বড্ড বেমানান। তাই ইলেকট্রিক বাস চলাচলের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে রাজধানীর গণপরিবহনের বেহাল দশা সংশোধন করা জরুরি। একইসঙ্গে ঢাকায় গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতেও জোর দেওয়ার দাবি তাদের।
পুরোনো বাস প্রতিস্থাপন
একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে যত পুরোনো বা লক্করঝক্কর বাস রয়েছে, তা পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে পুরোনো বাসগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন বাস চলাচলে কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথাও ভাবছে সরকার।
বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ হাজার ১৯৮টি। ঢাকায় নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ৫৪ হাজারের মতো। অর্থাৎ ৩০ শতাংশ বাস-মিনিবাস মেয়াদোত্তীর্ণ (২০ বছরের বেশি বয়সী)।
তবে বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে রাজধানীতে চলাচলকারী মেয়াদোত্তীর্ণ বাস-মিনিবাসের হার আরও বেশি। কারণ মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ে। প্রতিদিনই কোনও না কোনও যানবাহনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। সেই হিসাবে সংখ্যাটা আরও বেশি হবে। এছাড়া ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই, এমন যানবাহন এই মেয়াদোত্তীর্ণ যানের মধ্যে পড়ে না।
পুরোনো বাস প্রতিস্থাপন কীভাবে হবে, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে— রাজধানী থেকে পুরোনো বাস সরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু একবারেই তো তা সম্ভব নয়। এনিয়ে আবার বাস মালিকদের তোপের মুখে পড়তে হবে। তাই ধীরে ধীরে এই কাজ করা হবে। মানুষ যখন আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা পাবে, তখন এমনিতেই পুরোনো জিনিস বাদ দেবে। সরকারের পক্ষ থেকে লক্করঝক্কর বাস চলাচল কড়াকড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়েও চিন্তাভাবনা করছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
রাজধানীতে ইলেকট্রিক বাস চলাচলের বিষয়ে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। প্রযুক্তি নির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর পুরোনো সব বাসকে পর্যায়ক্রমে ইলেকট্রিক বাস দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হবে।
ইলেকট্রিক বাসগুলো কবে নাগাদ দেশে আসবে সেই বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, অনুমোদিত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বাসগুলো আনা হবে। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রথম দফায় বৈদ্যুতিক বাস আনার পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুতে ঢাকায় এসব বাস চালু করা হবে।
অভিন্ন কারিগরি মানদণ্ড
এই রূপান্তরকে সফল করতে সরকার একই সঙ্গে সারা দেশে কারিগরি মানদণ্ডের ভিত্তিতে একটি সর্বজনীন চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলছে।চার্জিং স্টেশনগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না, যার ফলে একটি সাধারণ চার্জিং ব্যবস্থার আওতায় বেসরকারি অপারেটররাও এসব সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) দেশের ৬৪টি জেলায় তাদের নিজস্ব জমিতে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলে এসব স্টেশন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেসরকারি অপারেটরদের জন্যও উন্মুক্ত করা হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-এর বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কারিগরি কমিটি বৈদ্যুতিক বাসের জন্য অভিন্ন কারিগরি মানদণ্ড প্রণয়ন করছে। এতে ব্যাটারিব্যবস্থা, চার্জিং প্রযুক্তি এবং যান্ত্রিক সহায়তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে বিভিন্ন নির্মাতা ও পরিচালকের যানবাহনের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
প্রাথমিকভাবে এসব মানদণ্ড বাসের জন্য প্রযোজ্য হলেও পরবর্তীতে তা বৈদ্যুতিক মিনিবাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ করা হবে, যা সরকারের বৃহত্তর পরিবহন বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির অংশ। বৈদ্যুতিক বাসের পাশাপাশি যেসব রুটে মেট্রো রেল সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্প নয়, সেখানে বিকল্প গণপরিবহন হিসেবে মনোরেল চালুর সম্ভাবনাও যাচাই করছে সরকার।
বেসরকারি খাতের তৎপরতা
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সভা হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারকে সহজ শর্তে ঋণ, নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দিয়ে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু বিআরটিসির মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে বাস চালানোর পরিবর্তে শুরু থেকেই সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমান অংশীদার করা উচিত। কারণ, দীর্ঘ মেয়াদে যাত্রীসেবা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পুরো ব্যবস্থাকে টেকসইভাবে পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি অপারেটরদেরও নিতে হবে।
পরিবহন খাত থেকে বায়ুদূষণ কমাতে সড়ক পরিবহনের অন্তত ৩০ শতাংশ যানবাহন বিদ্যুৎ-চালিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগে ইলেকট্রিক গাড়ির আমদানি শুল্ক কমানোসহ এই খাতে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হবে।
বিভিন্ন দেশের কোম্পানির আগ্রহ
ইতিমধ্যে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকংসহ বিভিন্ন দেশের ইলেকট্রিক বাস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে তাদের প্রস্তাব ও প্রযুক্তিগত উপস্থাপনা দিয়েছে। তবে কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাস কেনা হবে, সেই বিষয়ে এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি ইলেকট্রিক বাসের সম্ভাব্য দাম দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। ব্যাটারির সক্ষমতাসহ বাসের বিভিন্ন কারিগরি বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে দাম কমবেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞের সতর্কতা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ইলেকট্রিক বাস চালুর আগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ও বাস রুট রেশনালাইজেশনে। এসব ঠিক না করে শুধু বাস কিনলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের জন্যও একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, চার্জিং অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, ওয়ার্কশপ ও দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে সেবা দিতে হলে পুরো ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করতে হবে। অন্যথায় এসব দামি বাস পরে অচল হয়ে পড়ে থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
Shamiur Rahman
