প্রবীণ প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ ⊕ সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ⊕ নিরাপদ আবাসন ও মানবিক সেবার তীব্র সংকট
বার্ধক্যের পথে বাংলাদেশ
আগামী কয়েক দশকে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ওপর প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা আরও বাড়বে
বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই জনসংখ্যা ও কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জনমিতিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আধিক্যই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা প্রবাসী শ্রমবাজার—সব ক্ষেত্রেই এই তরুণ জনশক্তি দেশের অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করেছে।
কিন্তু এই জনমিতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ নীরবে প্রবেশ করছে এক নতুন যুগে—জনসংখ্যার বার্ধক্যের যুগে। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?
জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগ এবং জনসংখ্যাবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বের প্রায় সব দেশই একসময় জনসংখ্যার বার্ধক্যের মুখোমুখি হয়। জন্মহার কমে আসা, আয়ু বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ফলে মানুষের গড় আয়ু বাড়ে। এর ফলে সমাজে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একসময় যে দেশগুলো তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পরিচিত ছিল, সেগুলোও কয়েক দশকের মধ্যে বার্ধক্যজনিত নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুর তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বাংলাদেশও একই পথে এগোচ্ছে। স্বাধীনতার পর একজন নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ছিল ছয়েরও বেশি। বর্তমানে তা প্রতিস্থাপন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অন্যদিকে মানুষের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান কর্মসূচি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি দিন বেঁচে থাকছেন। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক অর্জন। কিন্তু এর সঙ্গে নতুন দায়িত্বও তৈরি হয়েছে।
জনসংখ্যাবিদরা বলেন, কোনো দেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ অতিক্রম করলে সেই দেশকে 'বার্ধক্যের পথে অগ্রসর' সমাজ হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তী কয়েক দশকে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস। অর্থাৎ আজ যে বিষয়টি ভবিষ্যতের সমস্যা বলে মনে হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতেই সেটি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পরিবার এবং রাষ্ট্রের অন্যতম বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হবে।
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। সেই সময় দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। হিসাব অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১ কোটি ৫৮ লাখ।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বলছে, বাংলাদেশ এখন জনমিতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এখনও বড় হলেও জনসংখ্যার বয়স কাঠামো ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে।
২০৫০ সালে প্রবীণ হবেন আরও বেশি মানুষ
বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা শুধু বাড়ছেই না, ভবিষ্যতে তাদের অনুপাতও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি। অর্থাৎ আগামী কয়েক দশকে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ওপর প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা আরও বাড়বে।
জনসংখ্যার এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ মানুষের আয়ু বৃদ্ধি এবং জন্মহারের পতন। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল বলছে, বাংলাদেশের মোট প্রজনন হার বর্তমানে প্রায় ২ দশমিক ৩-এর কাছাকাছি এবং মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় মানুষের আয়ুও বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জনসংখ্যায় প্রবীণ মানুষের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হবে। তাই মানুষের আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজকে স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার মতো বিষয়গুলোতেও প্রস্তুত হতে হবে।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সত্বেও বাড়ছে চাহিদা
বাংলাদেশ সরকার প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে ‘বয়স্ক ভাতা’ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে মাত্র ৪ দশমিক ০৩ লাখ মানুষকে নিয়ে এ কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়ে ৬১ লাখে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে জনপ্রতি মাসিক ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫০ টাকা এবং কর্মসূচির জন্য বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার ৭৯১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
এতে বোঝা যায়, গত কয়েক দশকে প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা কতটা বেড়েছে। তবে দেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের আনুমানিক সংখ্যা যখন ১ কোটি ৫৮ লাখের মতো, তখন ৬১ লাখ ভাতাভোগীর সংখ্যা মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে। একই সঙ্গে সব প্রবীণের প্রয়োজনও এক নয়—কারও প্রয়োজন অর্থনৈতিক সহায়তা, কারও চিকিৎসা, আবার কারও প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয় ও সঙ্গ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৬২ লাখ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার প্রবীণ মাসে ৭০০ টাকা এবং ৯০ বছরের বেশি বয়সী ২ লাখ ৫ হাজার ব্যক্তি মাসে ১ হাজার টাকা করে পাওয়ার কথা রয়েছে।
তবে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রবীণদের শুধু ভাতা দেওয়ার মধ্যে দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাঁদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার, মানসিক স্বস্তি, সামাজিক যোগাযোগ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পরিবেশ।
পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন
আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় বার্ধক্য নিয়ে আলোচনা খুবই সীমিত। পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের বিষয়টি কোনভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। যদিও পরিবারের বয়স্ক সদস্য তথা বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়া আমাদের সংস্কৃতির অংশ। একসময় তিন প্রজন্ম একসঙ্গে বসবাস করলেও এখন নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, ছোট পরিবার, বিদেশে অভিবাসন এবং কর্মব্যস্ত জীবন সেই প্রচলিত কাঠামোকে বদলে দিচ্ছে।
একসময় যৌথ পরিবারে যে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে পালন করা হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা একটি পরিবারের একজন সদস্যের ওপর এসে পড়ে। এছাড়া প্রায়শই দেখা যাচ্ছে, একক পরিবার অথবা যৌথ পরিবারের সদস্য সংখ্যা কম হওয়ায় প্রবীণ সদস্যরা একাকী জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে প্রবীণদের যত্ন নেওয়ার প্রচলিত পারিবারিক ব্যবস্থা আগের মতো আর কার্যকর থাকছে না। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করে নয়, বরং বাস্তবতা মেনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সহায়তার নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব
এদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোলেও তাদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেই গতিতে প্রস্তুত হচ্ছে না। বাংলাদেশও একই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কারণ প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ার অর্থ শুধু বেশি হাসপাতাল নয়; প্রয়োজন জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা, পুনর্বাসন, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, প্রশিক্ষিত সেবাকর্মী এবং প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যনীতি।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জেরিয়াট্রিক চিকিৎসাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। মেডিকেল কলেজগুলোতে বার্ধক্যজনিত রোগের বিশেষায়িত শিক্ষা, জেলা পর্যায়ে প্রবীণবান্ধব সেবা, ঘরে বসে স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থা ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং বিষণ্নতা অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতার মতোই গুরুতর হয়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা
বার্ধক্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার প্রভাব শুধু পরিবার বা স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতেও। কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমতে শুরু করলে উৎপাদনশীলতা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং কর আদায়ের সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যায় সরকারি ব্যয় বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাঁদের বড় অংশের কোনো পেনশন, অবসরভাতা বা স্বাস্থ্যবিমা নেই। কর্মজীবন শেষে নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের জীবিকা অনেকটাই নির্ভর করে পরিবারের ওপর। কিন্তু পরিবারের আয় যদি সীমিত হয়, তাহলে প্রবীণদের জীবনমানও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ বার্ধক্য শুধু বয়সের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন।
মূল সংকট একাকীত্ব ও নিরাপদ আশ্রয়ের
প্রবীণদের সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই কর্মক্ষমতা হারান, আয় কমে যায় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। পরিবারের সদস্যদের কর্মব্যস্ততা, সন্তানদের বিদেশে বা দেশের অন্য শহরে বসবাস, স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যু এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক প্রবীণকে একাকীত্বের মুখোমুখি হতে হয়।
বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রবীণদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নিয়মিত ওষুধ, চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, যেসব প্রবীণের দেখাশোনার জন্য পরিবারে কেউ নেই, তাঁদের পরিস্থিতি আরও কঠিন। এমন মানুষের জন্য শুধু মাসিক আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরাপদ বাসস্থান, চিকিৎসা, পুষ্টি, পরিচর্যা এবং একটি পরিবারসুলভ পরিবেশ।
প্রবীণরা সমাজের বোঝা নয় বরং অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার
জনসংখ্যার বার্ধক্যকে অনেক সময় অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। প্রবীণ নাগরিকরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ধারক। তাঁদের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক জ্ঞান ও জীবনবোধ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
ইউএনএফপিএ'র দৃষ্টিতে দীর্ঘায়ু মানবসভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন। অর্থনীতিবিদরা এই বাস্তবতাকে ‘সিলভার ইকোনমি’র চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা—দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেন। কারণ প্রবীণ জনগোষ্ঠী শুধু ব্যয়ের খাত নয়; সঠিক পরিকল্পনা থাকলে তাঁদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও জ্ঞানও জাতীয় উন্নয়নের সম্পদে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা প্রয়োজন। ধাপে ধাপে অবসরকালীন সঞ্চয়ব্যবস্থা, স্বেচ্ছা পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা এবং প্রবীণবান্ধব আর্থিক পণ্য চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে যাঁরা অবসরের পরও কাজ করতে সক্ষম, তাঁদের জন্য খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান, পরামর্শক হিসেবে কাজের সুযোগ কিংবা দক্ষতা হস্তান্তরের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। এতে একদিকে তাঁদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে দেশের উন্নয়নেও তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।
একাধিক বিশেষজ্ঞগন বলেন, প্রযুক্তি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিমেডিসিন, স্মার্ট স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, জরুরি সেবা ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড প্রবীণদের চিকিৎসা সহজ করতে পারে। একই সঙ্গে প্রবীণবান্ধব গণপরিবহন, নিরাপদ ফুটপাত, পার্ক এবং জনপরিসর গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন না হন।
রাষ্ট্রের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে সমাজকেও
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, করপোরেট খাত, শিল্পগোষ্ঠী, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি দেখায় যে সরকার প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। কিন্তু ভবিষ্যতে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা আরও বাড়লে কেবল ভাতা নয়—স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, নিরাপদ আবাসন ও সামাজিক অংশগ্রহণের জন্যও নতুন নতুন ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বার্ধক্যকে সংকট হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ আজকের কর্মক্ষম মানুষই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের জন্য এখন যে ব্যবস্থা তৈরি করা হবে, সেটিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করবে।
‘দ্য ফিন্যান্স টুডে’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মো. মতিউর রহমান বলেন, দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান বাস্তবতার নিরিখে এই মুহুর্তে প্রয়োজন সমাজের প্রবীণ নাগরিকদের জন্য নিরাপদ আবাসন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, পুষ্টিকর খাবার এবং মানসিক প্রশান্তির পরিবেশ তৈরি করা। একইসঙ্গে দরকার ধর্মীয় আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বই পড়া ও বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি করার, যাতে প্রবীণরা জীবনের শেষ অধ্যায়টি একাকীত্বে নয়, বরং আনন্দ ও মর্যাদার সঙ্গে কাটাতে পারেন।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া প্রবীণদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি সম্ভব হলে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পুনর্মিলনের উদ্যোগও নিতে হবে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রবীণরা জাতির বিবেক ও অভিজ্ঞতার প্রতীক। তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাতে পারে।
তিনি বলেন, প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও অংশ।জীবনের শেষ সময়ে কোনো প্রবীণ যেন চিকিৎসার অভাবে কষ্ট না পান, নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অসহায় হয়ে না পড়েন কিংবা একাকীত্বে দিন কাটাতে বাধ্য না হন; সেই বিষয়ে আমাদের এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয়
বাংলাদেশে যখন প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, তখন তাঁদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
দ্য ফিন্যান্স টুডের পাশাপাশি 'দৈনিক বর্তমান দিন' এবং দ্য ইনভেষ্টর পত্রিকারও সম্পাদক মো. মতিউর রহমান বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, শিল্পগোষ্ঠী, কর্পোরেট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসলে একটি মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
তার মতে, প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন—তাঁরা একটি জাতির স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের জীবন্ত ধারক। একটি সভ্য সমাজ তার প্রবীণদের প্রতি আচরণের মধ্য দিয়েই নিজের মানবিকতার পরিচয় দেয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন জীবনের শেষ অধ্যায়টিও নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্মানজনক হয়। সেই দৃষ্টিকোন থেকে আমাদের সমাজের প্রবীণ নাগরিকদের শেষ জীবন যদি নিরাপদ, সম্মানজনক ও আনন্দময় করা যায়, তবে সেটিই হবে একটি সত্যিকারের মানবিক সমাজের পরিচয়।
মো. মতিউর রহমান আরও বলেন, আজ যাঁদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব, আগামীকাল তাঁদের জায়গায় আমরাই থাকব। তাই প্রবীণদের জন্য বিনিয়োগ মানে শুধু একটি প্রজন্মকে সহায়তা করা নয়—বরং নিজেদের ভবিষ্যৎকে আরও মানবিক ও নিরাপদ করে তোলা।
সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়নের পথ অতিক্রম করছে, সেখানে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বিষয়টি আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী ইস্যু নয়; এটি বর্তমানের নীতিনির্ধারণের বিষয়। তাই আজ যদি আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা, নগর পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক নীতিতে বার্ধক্যের বাস্তবতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, তাহলে আগামী প্রজন্ম একটি প্রস্তুত রাষ্ট্র পাবে। আর যদি এই বিষয়টিকে আমরা উপেক্ষা করি, তাহলে জনসংখ্যাগত সাফল্যই একসময় নতুন সংকটে পরিণত হতে পারে।
Shamiur Rahman
