দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বন্ধ রাজবাড়ী পৌর শিশু হাসপাতাল
রাজবাড়ী শহরের নতুন বাজার বাসস্ট্যান্ডের বহরপুর বালিয়াকান্দি সড়কের পূর্বপাশে হাসপাতালটি অবস্থিত। হাসপাতালের সামনেই পৌর কবরস্থান। হাসপাতালে ঢুকতেই চোখে পড়ে একতালা বিশিষ্ঠ একটি জরাজীর্ণ ভবন। ভবনের চারপাশের পলেস্তারা খুলে গেছে। জানালাগুলোর গ্লাস ভেঙ্গে পরেছে। হাসপাতালের মূল ফটকের কলাপসিবল গেট ভাঙ্গা। ভবনের এক চতুর্থাংশ পর্যন্ত মাটিতে ঢেকে গেছে। পলেস্তারা খুলে যাওয়ায় “রাজবাড়ী পৌর শিশু হাসপাতাল” লেখাটি
আর্থিক সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে রাজবাড়ীর একমাত্র পৌর শিশু হাসপাতাল। হাসপাতাল ভবনের সামনে জন্মেছে আগাছা, লতাপাতা। ভবনের পাশেই মলমূত্র ত্যাগ করে স্থানীয় দোকানি ও পথচারীরা। ময়লা আবর্জনা আর দুর্গন্ধে একতলা ভবনটি যেন জরাজীর্ণ ভূতের বাড়িতে রূপ নিয়েছে। জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল না থাকায় নবজাতকসহ শিশুদের চিকিৎসার জন্য যেতে হয় ফরিদপুরে। এতে মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন স্থানীয়রা।
রাজবাড়ী পৌরসভা সূত্র জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে রাজবাড়ী পৌরসভার উদ্যোগে শহরের নতুনবাজার এলাকায় পৌর শিশু হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর সেখানে একজন চিকিৎসক রোগী দেখে শুধু ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন ২২ বছর। সর্বশেষ ওই হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলেন পৌরসভার মেডিকেল অফিসার ডা. আবদুর রশিদ। ২০১৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেন। এরপর হাসপাতালের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ডা. আবদুর রশিদ জানান, তিনি ১৯৯৮ সালের অক্টোবরে রাজবাড়ী পৌরসভার স্বাস্থ্য বিভাগে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। পৌরসভার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পৌর শিশু হাসপাতালে (ছুটির দিন বাদে) প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা করে রোগী দেখতেন। রোগী দেখে শুধু ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল কার্যক্রম। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিতেন এ শিশু হাসপাতাল থেকে। তারা ওষুধ কিনতেন বাইরের দোকান থেকে। অযন্তে অবহেলায় ভবনটিও এখন চলে গেছে পরিত্যক্তের তালিকায়। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে টিকা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। হাসপাতালটি পুনরায় চালুর দাবি স্থানীদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ী শহরের নতুন বাজার বাসস্ট্যান্ডের বহরপুর বালিয়াকান্দি সড়কের পূর্বপাশে হাসপাতালটি অবস্থিত। হাসপাতালের সামনেই পৌর কবরস্থান। হাসপাতালে ঢুকতেই চোখে পড়ে একতালা বিশিষ্ঠ একটি জরাজীর্ণ ভবন। ভবনের চারপাশের পলেস্তারা খুলে গেছে। জানালাগুলোর গ্লাস ভেঙ্গে পরেছে। হাসপাতালের মূল ফটকের কলাপসিবল গেট ভাঙ্গা। ভবনের এক চতুর্থাংশ পর্যন্ত মাটিতে ঢেকে গেছে। পলেস্তারা খুলে যাওয়ায় “রাজবাড়ী পৌর শিশু হাসপাতাল” লেখাটি প্রায় মুছে গেছে। জরাজীর্ণ ভবনে একটি কক্ষে সূর্যের হাসি ক্লিনিকের দুইজন নারীকর্মী কক্ষে বসে আছেন। ভবনের সামনেই একটি মসজিদ। দুই পাশে পাকা প্রাচীর। এক পাশে ব্যক্তি মালিকানা ঘর ও টিনের বেড়া। কাঠ ও সুপারি গাছ দিয়ে প্রবেশ পথে একটি বেড়া দেওয়া হয়েছে।
সূর্যের হাঁসি ক্লিনিকের সার্ভিস প্রমোটর মনীরা বলেন, আমরা ২০২০ সাল থেকে এখানে ফ্যামিলি ফ্লানিংয়ের সেবা প্রদান করে আসছি। প্রতি মঙ্গল ও বৃহম্পতিবার এখানে সেবা প্রদান করা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে নারীরা সেবা নিতে আসে। টিকা কার্যক্রমও এখানে চলে। কিন্তু আমরা দুইজনই নারী কর্মী এখানে বসি। এখানে কোন টয়লেট নেই, পানির ব্যবস্থা নেই। চারপাশে অনেক নোংরা। এখানে বসে থাকাটা খুবই কঠিন। তারপরও আমরা এখানে বসে মানুষকে সেবা প্রদান করে আসছি।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী হাশেম মিয়া বলেন, হাসপাতালটি অরক্ষিত ছিল। সন্ধ্যা হলেই এখানে মাদকের আড্ডা বসত। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিজস্ব উদ্যোগে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে বেঁড়া তৈরি করা হয়েছে। এখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
পৌর শহরের ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, ‘যখন হাসপাতালটি বানানো হলো তখন এই এলাকা ফাঁকা ছিল। দোকানপাট, বাড়িঘর কিছ্ইু ছিলনা। প্রতিদিন রশিদ ডাক্তার এখানে রোগী দেখতেন। গরীব মানুষ চিকিৎসা নিত। এখন হাসপাতালের জমিতে অনেক দোকান হয়েছে। মানুষও বেড়েছে। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। হাসপাতালটি চাল করা গেলে এই অঞ্চলের মানুষের জন্য খুবই উপকার হয়।’
হেলাল মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি বলেন, রাজবাড়ীতে শিশুদের জন্য তেমন কোন হাসপাতাল নেই। জেলা সদর হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। সেখানে আবার চিকিৎসক পাওয়া যায় না। কোন শিশু একটু জটিল রোগে আক্রান্ত হলেই তাকে ফরিদপুর অথবা ঢাকা নিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়। অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও জমির অভাবে হাসপাতাল স্থাপন করা যায় না। এখানে পর্যাপ্ত জমি রয়েছে। যে ভবনটি আছে তা ব্যবহারের অনুপযোগী। এখানে একটি আধুনিক শিশু হাসপাতাল স্থাপন করা গেলে রাজবাড়ী বাসীকে আর ফরিদপুর অথবা ঢাকা দৌঁড়াতে হবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ জানান, প্রায় ১০ বছর সময় ধরে বন্ধ এই শিশু হাসপাতালটি। রাতে এখানে উঠতি বয়েসের ছেলেরা নেশা করে আর দিনে স্থানীয়রা মলমূত্র ত্যাগ করে। শিশু হাসপাতালটি যখন চালু ছিল তখন অনেক মা তাদের সন্তানদের নিয়ে এখানে চিকিৎসার জন্য আসতেন। আমরা চাই জেলার একমাত্র শিশু হাসপাতালটি আবার সংস্কার করে চালু করা হোক। সরকারের কাছে নতুন ভবন নির্মাণ করে পুনরায় হাসপাতালটি চালুর দাবি জানাই।
রাজবাড়ী পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহা. রবিউল হক বলেন, এটি আসলে কোন হাসপাতাল নয়। এটি মূলত একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র। একসময় পৌরসভার উদ্যোগে একজন চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে রোগীদের সেবা প্রদান করা হতো। নানা কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। আমরাও চাই এই কেন্দ্রটি সচল করতে। কিন্তু ওখানে যে ভবনটি রয়েছে তা ব্যবহারের উপযোগী না। এটি এখন পরিত্যক্ত। আমরা বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করছি। যদি একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা যায় তাহলে পৌরসভা থেকে চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে মানুষকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করার ব্যবস্থা করা যাবে।
Shamiur Rahman
