সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা

অনলাইন জুয়া-বেটিং দমনে সংসদে নতুন আইন পাশ

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ০২ জুলাই ২০২৬ ০১:২৮ পিএম

প্রায় ১৫৯ বছর আগে প্রণীত (পাবলিক গামবলিংগ এ্যাকট ১৮৬৭) রহিত করে জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ নামে নতুন আইন কার্যকর করা হয়েছে

দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিচালিত জুয়ার বিস্তার রোধে যুগোপযোগী নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার।

প্রায় ১৫৯ বছর আগে প্রণীত (পাবলিক গামবলিংগ এ্যাকট ১৮৬৭) রহিত করে জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ নামে নতুন আইন কার্যকর করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বুধবার (১ জুলাই) আইনটি জারি করে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আইনটি কার্যকর হয়েছে।

নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল বেটিং, ফ্যান্টাসি বেটিং, ই-স্পোর্টস বেটিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের মতো ডিজিটাল অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামো, ভিপিএন বা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, বেটিং পরিচালনা, অ্যাকাউন্ট খোলা বা ব্যবহার, জুয়ার অর্থ জমা, উত্তোলন কিংবা স্থানান্তর করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

সাজা ও জরিমানার বিধান

বিদেশি অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি, এজেন্ট বা সহযোগী হিসেবেও কাজ করা যাবে না। আইনে সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন জুয়া বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ১ কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে।

অনলাইন বেটিং, বুকমেকার হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা কিংবা ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আদালত দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অথবা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে অযোগ্যও ঘোষণা করতে পারবেন।

জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জুয়ার প্রসারে অংশ নিলে গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট অথবা অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সংঘবদ্ধভাবে অথবা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।

আইনে জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে স্থানান্তর, গোপন বা বৈধ করার চেষ্টাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সম্পৃক্ত অপরাধ( পেডিকেট ওফেন্স) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে এই ধরনের অপরাধে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনও বিচার করা হবে।

নতুন আইনে আদালতকে অপরাধে ব্যবহৃত বা অপরাধলব্ধ ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ডিভাইসসহ সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। জুয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত ভবন, অফিস, কল সেন্টার, সার্ভার অবকাঠামো বা অন্য কোনো সম্পত্তিও আদালতের আদেশে বাজেয়াপ্ত করা যাবে।

কোনো কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং প্রোভাইডার বা পেমেন্ট গেটওয়ে এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়ী করা যাবে। পাশাপাশি আদালত ওই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত কিংবা বাতিলের নির্দেশ দিতে পারবেন। 

আইনি প্রক্রিয়া ও বিশেষ ক্ষমতা

জুয়া প্রতিরোধে গঠিত এই আইনটি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

জামিন অযোগ্য অপরাধ: এই আইনের অধীনে সব অপরাধ 'আমলযোগ্য', 'জামিন অযোগ্য' এবং 'আপস অযোগ্য' হিসেবে গণ্য হবে।

সাইবার ট্রাইব্যুনাল: অনলাইন জুয়া এবং সাইবার ভিত্তিক অপরাধের বিচার সরাসরি সাইবার ট্রাইব্যুনালে অনুষ্ঠিত হবে।

অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও সাইট ব্লক: আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা (নূন্যতম সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদা) অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে ফ্রিজ করতে পারবেন। এছাড়া জুয়া সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, অ্যাপ, আইপি অ্যাড্রেস ও ইউআরএল (URL) নিষিদ্ধ বা ব্লক করার ক্ষমতা সরকারের থাকবে।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: অনলাইন জুয়া শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (DPI) এবং ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করা হবে। একই সাথে একটি জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ ও ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবস্থা চালু করা হবে।

আইনগত জটিলতা এড়াতে এই বিশেষায়িত আইনটি পাসের পাশাপাশি বিদ্যমান সাইবার সুরক্ষা আইন থেকেও জুয়া সংক্রান্ত পূর্বের ধারাটি (ধারা ২০) বিলুপ্ত করা হয়েছে।

এই আইন বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), নির্বাচন কমিশন, সিআইডি, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনারও বিধান রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত পাবলিক গ্যামলিং এ্যাক্ট, ১৮৬৭ আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত হলো। তবে পূর্ববর্তী আইনের অধীনে চলমান মামলা ও কার্যক্রম নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী অব্যাহত থাকবে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত