কথাসাহিত্যিক সুলেখা সান্যাল: বিস্মৃত এক অগ্রণী সাহিত্যিকের জীবন, সংগ্রাম ও সৃজন

নেহাল আহমেদ প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২৬ ০৩:৫৪ পিএম

সুলেখা সান্যাল মাত্র দুটি উপন্যাস এবং অল্পসংখ্যক গল্প লিখলেও বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর সাহিত্য নারী-অধিকার, সামাজিক ন্যায়, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক সংগ্রামের শক্তিশালী দলিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলা সাহিত্যের মূলধারার আলোচনায় তিনি দীর্ঘদিন অবহেলিত থেকেছেন

বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এমন অনেক লেখকের নাম সময়ের ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে, যাঁদের সাহিত্যকীর্তি নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাঁদেরই একজন কথাসাহিত্যিক সুলেখা স্যানাল। মাত্র চৌত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেছিলেন, তা আজও নারীজীবন, শ্রেণিবৈষম্য, রাজনৈতিক চেতনা এবং মানবিক সংগ্রামের এক অনন্য দলিল।

১৯২৮ সালের ১৫ জুন তৎকালীন রাজবাড়ী গোয়ালন্দ মহকুমার (বর্তমান ফরিদপুর জেলার) কোরকদী গ্রামের এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। একসময় তাঁদের পরিবার নীলচাষের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কোরকদী শুধু সুলেখার জন্মস্থানই নয়; এই গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলেন তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা অবনী লাহিড়ী এবং ফরাসি ভাষাবিদ অবন্তীকুমার সান্যালের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও।

শৈশবের একটি অংশ কেটেছিল চট্টগ্রামে মাসির বাড়িতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে চট্টগ্রামে বোমাবর্ষণের পর তিনি নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। ১৯৪৪ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৬ সালে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এরপর কলকাতার ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউটে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। পরবর্তীতে স্কটিশ চার্চ কলেজেও অধ্যয়ন করেন। তবে ছাত্রজীবনেই বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে ১৯৪৭ সালের ২১ জানুয়ারি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। সহপাঠী অঞ্জনা গুহ ও অনিমা ঘোষের সঙ্গে এই গ্রেপ্তার তাঁর নিয়মিত শিক্ষাজীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরে জেল থেকেই বিএ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। জীবনের শেষদিকে তাঁকে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা সাহিত্যে ডিগ্রি প্রদান করে।

সুলেখার রাজনৈতিক চেতনা তাঁর সাহিত্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি তাঁর চিন্তাজগতে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক রামতনু লাহিড়ী, যিনি তাঁর মাতৃকুলের আত্মীয় ছিলেন।

আত্মজীবনের প্রতিচ্ছবি: ‘নবাঙ্কুর’

মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে লেখা ‘নবাঙ্কুর’ বাংলা সাহিত্যে এক মাইলফলক। বহু সমালোচকের মতে, এটি বাংলা ভাষায় কোনো নারী ঔপন্যাসিকের বেড়ে ওঠার প্রথম আত্মজৈবনিক উপন্যাস। ২০০১ সালে ইংরেজি অনুবাদে Nabankur প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলেও এটি পরিচিতি লাভ করে।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘ছবি’—এক গ্রামীণ জমিদার পরিবারের কিশোরী, যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বৈষম্য, নারী-পুরুষের অসম অধিকার এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং সমাজবাস্তবতার নির্মম অভিজ্ঞতা ছবির জীবনকে যেমন বদলে দেয়, তেমনি লেখিকার নিজের জীবনও সেই একই ইতিহাসের অংশ। ফলে ‘নবাঙ্কুর’ শুধু একটি উপন্যাস নয়, বরং একটি সময়ের দলিল।

ছোটগল্পে সমাজবাস্তবতার শক্তিশালী ভাষ্য

উপন্যাসের পাশাপাশি ছোটগল্পেও সুলেখা সান্যাল ছিলেন সমান শক্তিশালী। তাঁর একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘সিঁদুরে মেঘ’ প্রকাশিত হয় ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে। এতে স্থান পেয়েছে ‘জীবনায়ন’, ‘জন্মাষ্টমী’, ‘ফল্লু’, ‘গাজন সন্ন্যাসী’, ‘ছোটমাসি’, ‘খেলনা’সহ একাধিক স্মরণীয় গল্প।

পরবর্তীকালে তাঁর বোন সুজাতা সান্যাল (চট্টোপাধ্যায়) ‘সুলেখা সান্যালের গল্পসংগ্রহ’ প্রকাশ করেন, যেখানে আরও আঠারোটি গল্প সংকলিত হয়। এছাড়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে থাকা তাঁর বহু গল্প—‘অন্তরায়’, ‘কীট’, ‘সংঘাত’, ‘বিবর্তন’, ‘কিশোরী’, ‘খোলাচিঠি’, ‘ফাটল’, ‘ভাঙাঘরের কাব্য’ প্রভৃতি—বাংলা ছোটগল্পকে সমৃদ্ধ করেছে।

তাঁর গল্পগুলোর প্রধান বিষয় ছিল দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন, মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংকট, নারীর নিঃসঙ্গতা এবং সামাজিক বৈষম্য। ‘জীবনায়ন’, ‘খেলনা’ ও ‘বিবর্তন’-এর মতো গল্পে তিনি এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন, যেখানে ভালোবাসা, সংসার ও স্বপ্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাছে বারবার পরাজিত হয়।

সাহিত্যে ভিন্ন স্বর

সুলেখা সান্যালের সাহিত্যকে আলাদা করে তোলে তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা এবং বাস্তবজীবনের গভীর অভিজ্ঞতা। সমসাময়িক অনেক নারী লেখকের মতো তিনি শুধু গৃহজীবনের বৃত্তে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শ্রেণিসংগ্রাম এবং নারীস্বাধীনতার প্রশ্নকে সাহিত্যের কেন্দ্রে এনেছেন। তাঁর রচনায় ব্যক্তি ও সমাজ, প্রেম ও প্রতিবাদ, স্বপ্ন ও সংগ্রাম একসূত্রে গাঁথা।

রোগ, যন্ত্রণা ও শেষ জীবন

১৯৫৭ সালে তাঁর শরীরে লিউকেমিয়া ধরা পড়ে। উন্নত চিকিৎসার আশায় তিনি মস্কো পর্যন্ত গিয়েছিলেন; কিন্তু সুস্থ হয়ে ফিরতে পারেননি। জীবনের শেষ পাঁচ বছর তিনি অসুস্থতা, নিঃসঙ্গতা এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্যেও অবিরাম লিখে গেছেন। তাঁর অনুজা সুজাতা সান্যালের ভাষায়, এই সময়েই তিনি জীবনের তিক্ততা, শূন্যতা ও ব্যর্থতার গভীরতম শিল্পরূপ নির্মাণ করেছিলেন।

১৯৬২ সালের ৪ ডিসেম্বর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দেয়াল পদ্ম’, যা তাঁর অসমাপ্ত সাহিত্যজীবনের এক মূল্যবান স্মারক।

উত্তরাধিকার

সুলেখা সান্যাল মাত্র দুটি উপন্যাস এবং অল্পসংখ্যক গল্প লিখলেও বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর সাহিত্য নারী-অধিকার, সামাজিক ন্যায়, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক সংগ্রামের শক্তিশালী দলিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলা সাহিত্যের মূলধারার আলোচনায় তিনি দীর্ঘদিন অবহেলিত থেকেছেন।

আজ, নতুন করে তাঁর সাহিত্য পাঠের সময় এসেছে। কারণ সুলেখা সান্যাল কেবল একজন নারী লেখক নন; তিনি ছিলেন সময়কে অতিক্রম করা এক সাহসী কথাশিল্পী, যাঁর কলমে সমাজবাস্তবতা, প্রতিবাদ এবং মানবমুক্তির স্বপ্ন একাকার হয়ে উঠেছে। বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম আরও গভীর সম্মান ও গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হওয়া উচিত।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত