এক সহকারী রেজিস্ট্রারকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার করার পথ সুগম করতেই শর্ত শিথিল; প্রশাসনে ক্ষোভ
নিয়োগ নীতিমালা নিয়ে বিতর্কে ঢাবি: স্বচ্ছতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব
দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসের একজন সহকারী রেজিস্ট্রারকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বারবার নিয়োগের নীতিমালা পরিবর্তন করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রচলিত বিধি-বিধান ও দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক রীতিনীতি পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট একজন কর্মকর্তাকে সুবিধা দেওয়ার জন্য ধারাবাহিকভাবে যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রশাসন-১ শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার সুরাইয়া ইয়াসমিন কবিতা প্রশাসন-৫ (কাউন্সিল) শাখার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রশাসনিক শাখাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এই দপ্তর থেকেই সিন্ডিকেট সভার এজেন্ডা, সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন নীতিগত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রশাসন-৫-এর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ একাধিক ডেপুটি রেজিস্ট্রার থাকা সত্ত্বেও একজন সহকারী রেজিস্ট্রারকে এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার একটি সিদ্ধান্ত। ওই সভায় শূন্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রচলিত যোগ্যতার শর্ত পরিবর্তন করে অভ্যন্তরীণ প্রার্থীদের জন্য একটি শর্ত শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়। এরপরই ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
প্রশাসনের একাংশের দাবি, এই শর্ত শিথিলের ফলে পূর্বে আবেদন করার অযোগ্য একজন কর্মকর্তা আবেদন করার সুযোগ পান। তাদের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে সুরাইয়া ইয়াসমিন কবিতাকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে আবেদন ও নিয়োগের সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার চাকরিজীবনের শুরু নিয়েও প্রশাসনিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, শিক্ষাজীবনে একাধিক তৃতীয় বিভাগ থাকায় নিয়মিত নিয়োগের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া সম্ভব না হওয়ায় তাকে প্রথমে "নো ওয়ার্ক, নো পে" ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে চাকরির অভিজ্ঞতাকে বিশেষ বিবেচনায় এনে শর্ত শিথিল করে নিম্নমান সহকারী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে তিনি সহকারী রেজিস্ট্রার পদে উন্নীত হন।
কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, একই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বারবার কেন নিয়োগ বা পদোন্নতির শর্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন হচ্ছে? তাদের মতে, একজন কর্মকর্তা নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে উচ্চপদে যেতে পারেন। কিন্তু সরাসরি চতুর্থ গ্রেডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগের জন্য যোগ্যতার শর্ত পরিবর্তন করা হলে তা মেধাভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অঙ্গনে আরও অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাই বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী হওয়ায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মকর্তা বদলি, দায়িত্ব বণ্টন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি নীলদলের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রশাসনিক সুবিধা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি নিজেকে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচয় দিলেও ছাত্রদল বা বিএনপির কোনো সাংগঠনিক পদে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আঞ্চলিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, সহকারী রেজিস্ট্রার থেকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে নিয়মিত পদোন্নতির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত কর্মকর্তা। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের পদোন্নতি প্রক্রিয়াও এখনও সম্পন্ন হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত পদোন্নতির পরিবর্তে সরাসরি নিয়োগের জন্য শর্ত শিথিল করাকে তারা বৈষম্যমূলক বলে মনে করছেন।
তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডেপুটি রেজিস্ট্রার হওয়ার সুযোগ রাখেন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অপেক্ষাকৃত সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ব্যক্তিগত প্রভাব ব্যবহার করে দ্রুত নিয়োগের পথ তৈরি করা হচ্ছে। এতে মেধাবী কর্মকর্তারা বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে বলে তারা মনে করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে আরও আলোচনা রয়েছে যে, ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগের সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ চলছে। তবে, এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শতবর্ষ পেরোনো ইতিহাস, শিক্ষা, গবেষণা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অনন্য অবদানের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিয়োগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
Shamiur Rahman
