শাহজালাল বিমানবন্দরে সক্রিয় জাল ভিসা-মানবপাচার চক্র, যোগসাজশে ইমিগ্রেশন পার করার অভিযোগ, ৩ দিনেও কেউ
মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইটে ৫ জনের ভিসা জাল, উধাও ৭১ যাত্রী
২৪৫ জন যাত্রীর মধ্যে ৭৬ জনই যাত্রা বাতিল করে নীরবে সটকে পড়েন। এর মধ্যে কয়েকজন যাত্রীর ভিসার সঙ্গে পাসপোর্টের তথ্যে ব্যাপক গরমিল ধরা পড়ে
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালয়েশিয়াগামী একটি ফ্লাইটকে ঘিরে রহস্যজনক ঘটনা ঘটেছে। বোর্ডিং পাস সংগ্রহ এবং ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার পরও শেষ মুহূর্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ওঠেননি ৭১ জন যাত্রী। এর আগে বোর্ডিং গেটে পাঁচজন যাত্রীর ভিসা জাল বলে শনাক্ত হওয়ার পর ঘটনাটি সামনে আসে। এদিকে, চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার ৩ দিন পেরিয়ে গেলেও অদ্যাবধি এর সঙ্গে জড়িতদের একজনকেও শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
একাধিক গনমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী শনিবার (৪ জুলাই) রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-মালয়েশিয়া রুটের বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটটি রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যায়। ফ্লাইটটিতে মোট ২৮৮ জন যাত্রীর ভ্রমণের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৭৬ জন যাত্রী বিমানে ওঠেননি।
বিমান বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ বলছে, উক্ত ফ্লাইটের ১০ জন যাত্রীকে উড়োজাহাজে ওঠার আগেই আটকে দেয় ইমিগ্রেশন বিভাগ। এরপর আরও পাঁচ যাত্রীকে বিমানবন্দরের বোর্ডিং গেটে আটকে দেওয়ার পর ওই ফ্লাইটের আরও ৬১ জন যাত্রী আর বোর্ডিং গেটেই আসেননি। এর মধ্যে বোর্ডিং গেটে পাঁচজন যাত্রীর ভিসার সঙ্গে পাসপোর্টের তথ্যের অসঙ্গতি ধরা পড়ায় তাদের অফলোড করা হয়।
এরপর বোর্ডিং লাইনে থাকা আরও অনেক যাত্রী হঠাৎ সরে যান। পরে, তাদের অনেকেই ইমিগ্রেশনের প্রস্থান সিল বাতিল করে আবার দেশে প্রবেশ করেন। সব মিলিয়ে ৭১ জন যাত্রী শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় বিমানে না ওঠার সিদ্ধান্ত নেন।
সূত্র আরও জানায়, ওই ৭৬ জনের ভিসা যথাযথভাবে যাচাই ছাড়াই চেক-ইন কাউন্টার থেকে “ভেরিফায়েড” হিসেবে গ্রহণ করে বোর্ডিং পাস ইস্যু করা হয়েছিল। পরে ইমিগ্রেশনও তাদের বিদেশযাত্রার অনুমতি দেয়। কিন্তু বোর্ডিং গেটে গিয়ে পাঁচজনের জাল ই-ভিসা ধরা পড়ে।
ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, ভিসা যাচাইয়ের একাধিক ধাপ থাকার পরও কীভাবে সন্দেহভাজন জাল ভিসাধারীরা চেক-ইন ও ইমিগ্রেশন পার হয়ে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হলেন।
অন্তত দুটি গোয়েন্দা সংস্থার নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, একটি শক্তিশালী মানবপাচার চক্র 'বডি কন্ট্রাক্ট' সিস্টেমের মাধ্যমে পর্যটন ভিসায় মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর চেষ্টা করছিল। যথাযথ যাচাই ছাড়াই চেক-ইন কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস প্রদান এবং ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠেছে। ভিসা যাচাই প্রক্রিয়া এবং অবৈধ অভিবাসন রুখতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বর্তমানে পুরো নেটওয়ার্ক ও ইমিগ্রেশনে দায়িত্বরতদের খুঁজছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার চালু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে কিছু যাত্রী ট্যুরিস্ট ভিসার নামে মালয়েশিয়ায় কাজ করার জন্য ঢাকা ত্যাগ করার চেষ্টা করছিলেন। ইমিগ্রেশন পুলিশের বিষয়টি নজরে আসলে তারা যাত্রীদের অফলোড করেন।
অবৈধভাবে বিদেশ যেতে কাগজপত্রে ত্রুটি রেখেই বিনা বাধায় ইমিগ্রেশন পার করিয়ে দেয় একটি অসাধু চক্র, যা বিমানবন্দরে ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ নামে পরিচিত। এর সঙ্গে বিমানবন্দর এবং এয়ারলাইন্সের কিছু কর্মকর্তাও জড়িত থাকতে পারেন বলে গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা।
পুলিশের বিশেষ শাখার ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “আমার কাছে তাদের জাল ভিসা সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। তবে এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় একজন যাত্রী ট্যুরিস্ট ভিসায় যাচ্ছেন, কিন্তু তার আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে বিদেশে ভ্রমণের বিষয়টি মেলে না। এমন বেশ কিছু বিষয় মিলিয়ে সন্দেহের কারণ থাকে।”
এদিকে বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিমানে না ওঠা ৭৬ জনই ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। তবে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে দেশটিতে গিয়ে তাদের থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বোর্ডিং চলাকালে কয়েকজন যাত্রীকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। পরে তাদের ভিসায় অসঙ্গতি ধরা পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে লাইনে থাকা আরও কয়েকজন যাত্রী সেখান থেকে সরে যান। কিছুক্ষণ পর কয়েকজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অফলোড করা হলে বোর্ডিং গেট এলাকায় উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়।
এই ঘটনায় বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে, অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, ভিসা জটিলতা ও সন্দেহজনক কার্যকলাপের কারণে ইমিগ্রেশন পুলিশ কয়েকজন যাত্রীকে আগেই অফলোড করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মালয়েশিয়া হয়ে সৌদি আরবে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন বলেও জানা গেছে।
এই ঘটনাটি ঘিরে ভিসা যাচাই, ইমিগ্রেশন নিরাপত্তা এবং ট্রাভেল এজেন্সির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
উল্লেখ্য, যে কোন সময়ে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে যেতে পারে। তবে, এই শ্রমবাজার যাতে খোলা না হয় সেজন্য বাংলাদেশেরই একটি পক্ষ নানা বিতর্ক ছড়াচ্ছে। আর এতে নেপথ্যে মদদ দিচ্ছেন বায়রার শীর্ষ একাধিক ব্যবসায়ী।
এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ শাহজালাল বিমানবন্দরে মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইটে চাঞ্চল্যকর এই অনিয়ম দেশের জন্য বড় ধরনের এক অশনিসংকেত। অবিলম্বে রাষ্ট্রবিরোধী এসব গুপ্ত কার্যক্রম প্রতিরোধ এবং এর সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি করেছেন সাধারণ জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা।
Shamiur Rahman
