খাতুনগঞ্জ থেকে বন্দর, ক্ষতিগ্রস্ত জাতীয় অর্থনীতি
জলাবদ্ধতার অভিশাপে থমকে যাচ্ছে চট্টগ্রাম:
ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি নামতে না পারার পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা দখল, পাহাড় কাটা, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর, প্রাচীনতম আন্তর্জাতিক নদীবন্দর, সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার এবং অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই নগরী প্রতিদিন দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহকে সচল রাখে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—সামান্য বৃষ্টি হলেই এই প্রাণচঞ্চল নগরী যেন অচল হয়ে পড়ে। রাস্তায় জমে থাকা পানি শুধু মানুষের চলাচলই ব্যাহত করে না, থামিয়ে দেয় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও বন্দরের কার্যক্রমও। ফলে জলাবদ্ধতা আজ আর শুধু নগর ব্যবস্থাপনার একটি সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
শৈশবে আমরা শিখেছি, পানি সবসময় নিচের দিকে গড়িয়ে যায়। প্রকৃতির এই সহজ নিয়ম চট্টগ্রামে যেন কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। কর্ণফুলি নদীর তীরে অবস্থিত শহরটির গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ থেকে ৩১ মিটার। তবু অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই নগরীর সড়ক, অলিগলি, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা পানিতে ডুবে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি নামতে না পারার পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা দখল, পাহাড় কাটা, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা।
চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি স্বভাবতই বৈচিত্র্যময়। একদিকে কর্ণফুলি নদীর নিম্নাঞ্চল, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢাল। নদীতীরবর্তী অনেক এলাকার উচ্চতা মাত্র ৫ থেকে ৬ মিটার, আবার বাটালি পাহাড়ের মতো স্থানে উচ্চতা প্রায় ৮৫ মিটার। এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নগর ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৭ সালে সরকার ‘চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প’ গ্রহণ করে। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকায়। বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ)। এ পর্যন্ত ৮ হাজার কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় হলেও প্রকল্পের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি; অগ্রগতি প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও প্রতি বছর জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে কর্পোরেশনের মোট বাজেট প্রায় ২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা, যার মধ্যে জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১১২ কোটি টাকা। গত কয়েক বছর ধরেই এ খাতে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হলেও নগরবাসী কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না।
জলাবদ্ধতার সবচেয়ে নির্মম প্রভাব পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। দিনমজুরেরা কাজে যেতে পারেন না, রিকশাচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় বন্ধ হয়ে যায়, ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারে রান্না বন্ধ থাকে, শিশুদের খাবারের সংকট দেখা দেয়। জলাবদ্ধতা তাদের কাছে শুধু সাময়িক দুর্ভোগ নয়; এটি জীবিকা ও বেঁচে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলে।
অন্যদিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে সাধারণ দিনে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু জলাবদ্ধতার সময় সেই লেনদেন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টিইইউ (TEU) কনটেইনার ডেলিভারি হলেও জলাবদ্ধতার কারণে তা কমে প্রায় ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টিইইউতে নেমে আসে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বিলম্বিত হয়, বেড়ে যায় ব্যবসায়ীদের ব্যয়।
গার্মেন্টস শিল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। শ্রমিকরা সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। ছোট-বড় ব্যবসা, পরিবহন, ব্যাংকিং এবং সরবরাহ ব্যবস্থাসহ প্রায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়ে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিদিন কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
জলাবদ্ধতার কারণ বহুদিন ধরেই জানা। খাল ও জলাশয় দখল, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, পাহাড় কাটা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি—এসব কারণ মিলেই আজকের সংকট সৃষ্টি করেছে। প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহিতা।
সমাধানও অজানা নয়। নগরীর সব খাল ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে। নিয়মিত খাল ও ড্রেন খনন, পাহাড় কাটা কঠোরভাবে বন্ধ, ব্যবসায়িক অঞ্চল ও বন্দর এলাকায় আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়।
চট্টগ্রাম কেবল একটি শহর নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম ভিত্তি। এই নগরী সচল থাকলে সচল থাকে দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ। তাই জলাবদ্ধতাকে শুধু মৌসুমি দুর্ভোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় উন্নয়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি সংকট।
প্রকৃতিকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে ফিরিয়ে দিতে পারলেই চট্টগ্রামও ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক গতি। খাল, নদী ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তখনই কর্ণফুলীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক বন্দরনগরী আবারও দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবে, আর বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী
Shamiur Rahman
