বাংলাদেশ কি সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের খপ্পরে?
সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র, গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী শক্তি শিক্ষা, গণমাধ্যম, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, সংগীত, বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও মূল্যবোধকে ধীরে ধীরে নিজেদের অনুকূলে গড়ে তোলে
আজকের বিশ্বে যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না; মানুষের চিন্তা, রুচি, ভাষা, পোশাক, বিনোদন ও জীবনবোধের ওপর প্রভাব বিস্তার করেও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই নীরব প্রক্রিয়ার নাম সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এটি মানুষের মনকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে মানুষ অনেক সময় নিজের অজান্তেই অন্যের সংস্কৃতিকে উন্নত, আধুনিক ও আদর্শ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
বাংলাদেশও কি এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের খপ্পরে পড়েছে? প্রশ্নটি অমূলক নয়। আজ আমরা কি আমাদের নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, লোকসংগীত, লোকজ সংস্কৃতি, পোশাক ও ঐতিহ্যের চেয়ে বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছি না? আমাদের সন্তানরা কি নিজেদের ইতিহাসের চেয়ে বিদেশি চরিত্র, ভাষা ও জীবনধারার সঙ্গে বেশি পরিচিত হয়ে উঠছে না? এসব প্রশ্ন আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র, গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী শক্তি শিক্ষা, গণমাধ্যম, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, সংগীত, বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও মূল্যবোধকে ধীরে ধীরে নিজেদের অনুকূলে গড়ে তোলে।
ইতালির চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি এই ধারণার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, সমাজকে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে শুধু শক্তি প্রয়োগ করলেই হয় না; মানুষের চিন্তা ও সম্মতিকেও নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে হয়।
এই প্রভাব এতটাই সূক্ষ্ম যে অনেকেই তা বুঝতে পারেন না। কখনও কখনও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, গণমাধ্যম কিংবা সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও সচেতন বা অসচেতনভাবে এই প্রভাবের বাহক হয়ে ওঠেন। ফলে একটি জাতি ধীরে ধীরে নিজের সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।
তবে অন্য সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা বা বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হওয়া কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন নিজের ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়কে তুচ্ছ মনে করে অন্যের সংস্কৃতিকেই একমাত্র আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তখন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জাতির আত্মপরিচয় দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই সময়ের দাবি হলো—বিশ্বের জ্ঞান ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি নিজের ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। যে জাতি নিজের সংস্কৃতিকে সম্মান করতে শেখে, সেই জাতিই বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষা করা তাই কেবল সংস্কৃতির প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয় রক্ষারও প্রশ্ন।
Shamiur Rahman
