অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত অব্যাহত, ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ

তদন্ত চলাকালেই চসিকের আলোচিত প্রকৌশলী দম্পতির বদলি

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:৪১ পিএম

বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগ পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং ফারজানা মুক্তাকে রংপুর সিটি করপোরেশনে পদায়নের আদেশ দেয়

অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্তাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) আলোচিত প্রকৌশলী দম্পতি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী এবং তার স্ত্রী নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তাকে বদলি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগ পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং ফারজানা মুক্তাকে রংপুর সিটি করপোরেশনে পদায়নের আদেশ দেয়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আলোচিত ও বিতর্কিত এই দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই বদলির সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক মহলে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

প্রজ্ঞাপনে যা বলা হয়েছে

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং ফারজানা মুক্তাকে রংপুর সিটি করপোরেশনের শূন্যপদে বা সমপদে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এতে আরও বলা হয়, নতুন কর্মস্থল থেকেই তারা নিজ নিজ বেতনক্রম অনুযায়ী বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করবেন। পাশাপাশি জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি, অবসরসহ সব প্রশাসনিক বিষয়ও নতুন কর্মস্থল থেকেই নিষ্পন্ন হবে।

আগামী ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় ২৭ জুলাই থেকে তাদের ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।

তদন্ত চলমান

শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তার বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর স্থানীয় সরকার বিভাগ গত ৯ জুলাই সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেয়।

তদন্ত কমিটিকে অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও প্রতিবেদন এখনও জমা হয়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাদের বদলির আদেশ জারি হওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদন নিয়েও আলোচনা

চসিকের সংস্থাপন শাখার গত ২৫ জুনের এক স্মারক থেকে জানা যায়, মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে এক বছরের ছুটির আবেদন করেন।

চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন আবেদনটি সুপারিশসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে পাঠান। তবে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তার বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদন নিয়েও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কে শাহীন

দাফতরিক নথি অনুযায়ী, মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে ঘিরে প্রশাসনিক বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৭ সালে একটি অভিযোগের ঘটনায় তিনি সাময়িকভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি পান। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে পুনরায় চাকরিতে ফিরে আসেন।

পরবর্তীতে ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি সহকারী প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। এরপর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বও পালন করেন।

আগেও হয়েছিল বদলি

এর আগে ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রশাসনিক কারণে তাকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়েছিল। একই সময়ে চসিকের সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাশেমকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়।

তবে সে সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে প্রকৌশলীর সংকটের কথা উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি পাঠায় তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়। চিঠিতে বলা হয়েছিল, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ শূন্য থাকায় প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। পরবর্তীতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে আবার চসিকে ফিরিয়ে আনা হয়।

অভিযোগের সূত্রপাত

সর্বশেষ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে চট্টগ্রামের বাসিন্দা মেহেদী চৌধুরী লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাইরে বদলির দাবি জানানো হয়।

সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই স্থানীয় সরকার বিভাগ তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আলোচিত এই প্রকৌশলী দম্পতির বদলির সিদ্ধান্ত এখন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত