থার্ড টার্মিনালে ৩,২০০ কোটি টাকার অনুমোদনহীন ব্যয়!

শাহজালালে আরেক ‘বালিশ-কাণ্ড’: ৫০০ টাকার গাছ লাখ টাকায়, ফিতা কাটতেই ৪৪ কোটি

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২৬ ০৪:২৯ পিএম

থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের এই ব্যয়ের ধরন ২০১৯ সালের বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘বালিশ-কাণ্ডের’ কথা মনে করিয়ে দেয়। ওই প্রকল্পে প্রতিটি বালিশের দাম ৫ হাজার থেকে ৮৯ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল

☞ থার্ড টার্মিনালে ৩,২০০ কোটি টাকার অনুমোদনহীন ব্যয়!

☞ সিএজির বিশেষ নিরীক্ষায় ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র;

☞ পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যয় বৈধ করার চেষ্টা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পকে ঘিরে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়, ৫০০ টাকার গাছ লাখ টাকায় ক্রয়, আংশিক উদ্বোধনের ফিতা কাটতে ৪৪ কোটি টাকা, বিদ্যমান জলাশয়কে নতুন পুকুর দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা উত্তোলন এবং নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার নামে ২১৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের মতো বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে বিশেষ নিরীক্ষায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ব্যয় এখন পোস্ট-ফ্যাক্টো (পরবর্তী) অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কার্যকর হলে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।

সিএজির নিরীক্ষায় বেরিয়ে এলো বিস্ফোরক তথ্য

সম্প্রতি মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় একের পর এক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে অতিরিক্ত কাজের জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ব্যয়ের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে প্রায় ২৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

এছাড়া ৬৩০টি আইটেমে ভেরিয়েশন দেখিয়ে কোনো যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়েছে।

৫০০ টাকার গাছের দাম লাখ টাকা!

থার্ড টার্মিনালের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন গাছ কেনা হয়। প্রকল্প নথিতে এসব গাছের একেকটির মূল্য ধরা হয়েছে ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। অথচ বিমানবন্দরের আশপাশের নার্সারিগুলোতে একই ধরনের গাছের বাজারমূল্য মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।

এসব গাছ কেনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। পরে পরিচর্যার নামে আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা যোগ করা হয়েছে।

বিমানবন্দরসংলগ্ন এক নার্সারি মালিক রবিউল ইসলাম বলেন, "এই গাছগুলোর দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি নয়। লাখ টাকার গাছ এগুলো নয়।"

জলাশয়কে পুকুর দেখিয়ে লোপাট ১০ কোটি

নিরীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, প্রকল্প এলাকায় আগে থেকেই থাকা একটি জলাশয়কে নতুন পুকুর নির্মাণ দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

গুগল আর্থের পুরোনো স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেখানে পূর্ব থেকেই জলাশয় ছিল। শুধু সংস্কার করেই সেটিকে পুকুরে রূপ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, চুক্তি অনুযায়ী মাটি প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে ফেলার কথা থাকলেও অধিকাংশ মাটি দুই কিলোমিটারের মধ্যেই ফেলা হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারকে দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহনের বিল দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ ৮৩ কোটি টাকা।

ফিতা কাটতেই ৪৪ কোটি টাকা!

নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই তৎকালীন সরকারের ইচ্ছায় সীমিত পরিসরে থার্ড টার্মিনালের উদ্বোধন করা হয়।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ওই সফট ওপেনিং অনুষ্ঠানের ফিতা কাটা ও সংশ্লিষ্ট আয়োজনের জন্য ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যদিও মূল চুক্তিতে এ ধরনের কোনো ব্যয়ের উল্লেখ ছিল না।

অতিরিক্ত বিলের ছড়াছড়ি

মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও যে অসংগতি এবং অতিরিক্ত বিলের উল্লেখ করা হয়েছে—

➤ ডিজেল পাম্প সরবরাহে প্রায় ১২ কোটি টাকা

➤ ইউপিএস সরবরাহে ৪৮ কোটির বেশি

➤ জ্বালানি তেলে ৪১ কোটি টাকা

➤ চুক্তির বাইরে 'মুভ ফরোয়ার্ড কস্ট' হিসেবে বিল

➤ নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার নামে ২১৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ

➤ মূল্যবৃদ্ধি ও কনটিনজেন্সি খাত থেকে নিয়মবহির্ভূত ওভারটাইম বিল

➤ অপসারণযোগ্য মাটি বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া

এসব ব্যয়ের অধিকাংশই নিরীক্ষকদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ বলে বিবেচিত হয়েছে।

রূপপুরের ন্যায় 'বালিশ-কাণ্ড' থার্ড টার্মিনালে

সংশ্লিষ্টদের মতে, থার্ড টার্মিনালের ব্যয়ের ধরন অনেকটাই ২০১৯ সালের বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের 'বালিশ-কাণ্ড'-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন প্রতিটি বালিশের দাম ৫ হাজার থেকে ৮৯ হাজার টাকা দেখিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম হয়েছিল।

২২ হাজার কোটির প্রকল্পে নতুন বিতর্ক

২০১৭ সালে গৃহীত থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শুরু হয়। জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) ছিল প্রকল্পের ঠিকাদার। এই প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়ন করেছে জাইকা (JICA)।

'যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারাই তদন্ত কমিটিতে'

অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ডিসপিউট বোর্ড ও অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করলেও অভিযোগ রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তাদেরই কয়েকজনকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, প্রকল্পের সব ভেরিয়েশন ও ব্যয় চুক্তি এবং জাইকার অনুমোদনের আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের মাধ্যমে এসব ব্যয় বৈধ করা হলে সেটি হবে "আরেকটি দুর্নীতি"। এতে ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলোতেও একই ধরনের অনিয়ম উৎসাহিত হবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ, অতিরিক্ত অর্থ উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এই ধরনের 'পুকুরচুরি' বন্ধ হবে না।

সরকারের অবস্থান

বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ওঠা প্রতিটি অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা হবে। কারা ভুয়া ভেরিয়েশন করেছে, কত টাকা আত্মসাৎ হয়েছে এবং কারা জড়িত—সবকিছু খতিয়ে দেখা হবে। দুর্নীতির অভিযোগ কোনোভাবেই অ্যামিকেবল সেটেলমেন্টের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে না; দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেষ কথা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর অন্যতম থার্ড টার্মিনাল দেশের ভাবমূর্তির প্রতীক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে আসা অভিযোগ বলছে, উন্নয়নের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের চিত্র।

এখন প্রশ্ন একটাই—পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের আড়ালে কি এই বিতর্কিত ব্যয় বৈধতা পাবে, নাকি নিরপেক্ষ তদন্তে উন্মোচিত হবে প্রকৃত দায়ীদের মুখোশ?

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত