ময়লা বাণিজ্য ও ফুটপাত দখল নিয়ে বিরোধে যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার ছক
মিরপুরে যুবদল কর্মী হত্যা: ২৫ লাখ টাকায় চার শুটার ভাড়া করেন হাফিজ
সোমবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান
রাজধানীর মিরপুরে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ হত্যা মামলার তদন্তে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সংস্থাটির দাবি, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চঞ্চল মোল্লা, জিয়াউল হক মোল্লা জিয়া, মাসুম বিল্লাহ এবং জিহাদ নামে চার পেশাদার শুটার ভাড়া করেন কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজ। তবে পরিকল্পিত ওই হামলায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিহত হন যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—চঞ্চল, জিহাদ মোল্লা (৩০), জিয়ারুল মোল্লা (৩৯), মাসুম বিল্লাহ (২৮), নাহিদ হাসান (২১), আবির হাওলাদার (২৫), আলী হোসেন (৪৫) এবং শাফিন আহমেদ (২২)।
ডিবি জানায়, গত ২৩ জুলাই কাফরুল থানার ওপেক্স গার্মেন্টসের দক্ষিণ পাশের লিংক রোডে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবদল কর্মী ইউসুফ নিহত হন। এসময় সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। হামলার পর পালানোর সময় স্থানীয় জনতা অস্ত্রধারী চঞ্চলকে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
তদন্তে ডিবির দাবি, স্থানীয় ময়লার টেন্ডার, ফুটপাতের দোকান, ব্যবসা এবং একটি টিনশেড বাড়ির দখলকে কেন্দ্র করে সিএনজি হাফিজের সঙ্গে কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরে বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুন প্রথম দফায় হত্যাচেষ্টা চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হলেও অস্ত্রে মিসফায়ারের কারণে তা ব্যর্থ হয়। পরে গত ২৩ জুলাই চার শুটারকে ঢাকায় এনে মিরপুরের ‘হোটেল প্রাইম’-এর ৯ তলায় রাখা হয়। ওই হোটেলে বসেই হাফিজ ও তার প্রতিনিধিরা শুটারদের সঙ্গে নিয়ে যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার ছক কষে। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হাফিজ শুটারদের ৩টি আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করেন।
পরদিন, অর্থাৎ ২৪ জুলাই সন্ধ্যা থেকে চার শুটার ও তাদের সহযোগীরা বাবুকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা মিরপুর-১৩, ই-ব্লকের ওপেক্স গার্মেন্টসের সামনে এসে ঘোরাঘুরি করতে থাকলে বাবুর সহকর্মীদের সন্দেহ হয় এবং তারা শুটারদের পরিচয় জানতে চেয়ে চ্যালেঞ্জ করেন। পরিস্থিতি টের পেয়ে যুবদল কর্মী ইউসুফ এক শুটারকে জাপটে ধরলে, ওই শুটার কোমর থেকে পিস্তল বের করে সরাসরি ইউসুফের বুকে ঠেকিয়ে গুলি চালায়। এতে মূল টার্গেট যুবদল নেতা বাবু অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান ইউসুফ।
পুলিশের দাবি, ঘটনার রাতে বাবুর অফিসের সামনে অবস্থান নেওয়া সন্দেহভাজনদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের মিরপুর-১০ এলাকার বাসিন্দা বলে পরিচয় দেয়। পরে তল্লাশির চেষ্টা করা হলে একজন অস্ত্র বের করে ইউসুফকে গুলি করে। এসময় দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে আরও দুজন আহত হন।
ঘটনার পরপর স্থানীয় জনতা অস্ত্রসহ শুটার চঞ্চল মোল্লাকে ধরে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। পরবর্তীতে থানা ও ডিবি পুলিশের যৌথ অভিযানে জিহাদ এবং জিয়াউল হক মোল্লা জিয়া নামে আরও দুই কিলারকে গ্রেপ্তার হয়। একইসঙ্গে কিলারদের ভাড়া করা ও এলাকা চিনিয়ে দেওয়ার অভিযোগে নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান ও মো. শাফিন ছৈয়াল নামে দুই সহযোগীকে আটক করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, তদন্তে রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধী হিসেবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, ২৫ লাখ টাকার চুক্তির পেছনে মূলত এলাকার ময়লা নিয়ন্ত্রণ, জমি ও ফুটপাত দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধ কাজ করেছে।
ডিবি আরও জানায়, তদন্তে সিএনজি হাফিজকে পরিকল্পনার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। চুক্তির অর্থের একটি অংশ অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল এবং অভিযুক্তদের থাকা-খাওয়ার খরচও বহন করা হয়। এই ঘটনায় একটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অস্ত্রের উৎস শনাক্তে তদন্ত চলছে। রাজনৈতিকবিশ্লেষণ
ডিবির তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় কাফরুল থানায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। হত্যা মামলাটি বর্তমানে ডিবির তদন্তাধীন রয়েছে এবং অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
Shamiur Rahman
