গোল্ডেন ভিসার আওতায় ৪৫৯ বাংলাদেশির ৯৭২ প্রপার্টি; তিন বছরেও শেষ হয়নি অনুসন্ধান

১০০ বাংলাদেশির সম্পদের নথি উদ্ধারে দুবাই যাওয়ার অপেক্ষায় দুদক

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬ ১০:৪৫ এএম

তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলমান অনুসন্ধানে প্রথম ধাপে ৭০ জনকে শনাক্ত করে অনুসন্ধান টিম। পরে আরও ২০-২৫ জনের মতো ব্যক্তির নথি সংগ্রহ করে দুদক। যারা মূলত বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচির আওতায় দুবাইয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়

বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার করে গোল্ডেন ভিসায় দুবাইয়ে যাওয়া ৪৫৯ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে ৯৭২টি প্রপার্টি (সম্পদ) কেনার অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলমান অনুসন্ধানে প্রথম ধাপে ৭০ জনকে শনাক্ত করে অনুসন্ধান টিম। পরে আরও ২০-২৫ জনের মতো ব্যক্তির নথি সংগ্রহ করে দুদক। যারা মূলত বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচির আওতায় দুবাইয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর প্রায় ১০০ ব্যক্তির নথি উদ্ধারে দুবাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল দুদক। কমিশন নিষ্ক্রিয় থাকায় তা আপাতত আটকে আছে।

দুবাই সফর শেষ মুহুর্তে স্থগিত

অনুসন্ধান বলছে, সন্দেহভাজনদের কর নথি, ব্যাংকিং তথ্য, বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের রেকর্ড ও সম্পদের বেশকিছু নথিপত্র সংগ্রহ করে। ওই সব তথ্য যাচাই শেষে পারস্পরিক আইনি সহায়তা কাঠামো ব্যবহার করে ইউএই কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় দুবাইয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করেছিল বলে জানা গেছে।

উক্ত পরিকল্পনা শেষ পর্যস্ত বাস্তবায়ন হয়নি, প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে কমিশনের চেয়ারম্যানসহ কমিশনারদের পদত্যাগে সবকিছু আটকে যায় বলে জানা গেছে। যদিও দুদকের অন্য একটি সূত্র বলছে ভিসা জটিলতায় ওই বিশেষ টিম যেতে পারেনি তবে টিমের প্রস্তুতি রয়েছে।

শুধু দেশীয় নথি দিয়ে তদন্ত সম্ভব নয়

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, দেশ থেকে অর্থ পাচার করে গোল্ডেন ভিসায় দুবাইয়ে সাড়ে ৪০০ ব্যক্তি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এমন অভিযোগে নথিপত্র সংগ্রহ করছে দুদক। এই খুঁটিনাটি তথ্য পেতে বিএফআইইউতে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। এই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ৭০ জনকে শনাক্ত করে গত বছর এনবিআরকে চিঠিও দেয় দুদক। যা এখন যাচাই-বাছাই চলছে।

অন্যদিকে, দুদকের অন্য একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, শুধু বাংলাদেশের নথি দিয়ে অর্থপাচারের অনুসন্ধান শেষ করা সম্ভব নয়। কারণ সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, বেনিফিশিয়াল ওনার, ক্রয়মূল্য, লেনদেনের উৎস, গোল্ডেন ভিসার আবেদনপত্র, দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের রেকর্ড এবং ব্যাংকিং তথ্য যাচাই ছাড়া অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন। সেই কারণে তদন্তের পরবর্তী ধাপে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সরেজমিন অনুসন্ধানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে দুদক। অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে বিদেশে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন কমিশন গঠন হলেও একটি বিশেষ টিম পাঠানো চেষ্টা থাকবে।

তিনি বলেন, অর্থ পাচার সংক্রান্ত ভিন্ন ভিন্ন কাজে গত বছরের শুরুতে এনবিআরের একটি বিশেষ টিম দুবাই ঘুরে এসেছে বলে জানি। সেখানে গিয়ে তারা বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। যদিও তাদের বিষয়বস্তু ভিন্ন ছিল। আমরাও মনে করি, শুধু টেবিলে যাচাই-বাছাই করে অনুসন্ধান কাজ শেষ করা যায় না। অর্থপাচারকারীদের জন্য দুবাই একটি খুবই নিরাপদ স্থান। অতএব চিঠি চালাচালি করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা সম্ভব নয়।

গোল্ডেন ভিসায় সন্দেহভাজন বিনিয়োগকারী যারা

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে গোল্ডেন ভিসায় বিনিয়োগকারী ৭০ জনের কর শনাক্তকরণ নম্বরসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়ে এনবিআরের কাছে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত চেয়েছিল দুদক। যাদের কারও কারও নথিপত্র দুদকে সরবরাহ করা হয়।

দুদকের উপপরিচালক ও তৎকালীন অনুসন্ধান টিমের লিডার রাম প্রসাদ মণ্ডলের সই করা চিঠিতে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার করা অর্থের মাধ্যমে দুবাইয়ে সম্পত্তিগুলো কেনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

সন্দেহভাজন ৭০ বাংলাদেশির মধ্যে রয়েছেন— আহসানুল করীম, আনজুমান আরা শহীদ, হেফজুল বারী মোহাম্মদ ইকবাল, হুমায়রা সেলিম, জুরান চন্দ্র ভৌমিক, মো. রাব্বী খান, মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ অলিউর রহমান, এস এ খান ইখতেখারুজ্জামান, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সৈয়দ ফাহিম আহমেদ, সৈয়দ হাসনাইন, সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ রুহুল হক, গোলাম মোহাম্মদ ভুঁইয়া, হাজী মোস্তফা ভুঁইয়া, মনজ কান্তি পাল, মো. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, মো. মাহবুবুল হক সরকার, মো. সেলিম রেজা, মোহাম্মদ ইলিয়াস বজলুর রহমান, এস ইউ আহমেদ, শেহতাজ মুন্সী খান, এ কে এম ফজলুর রহমান, আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, গুলজার আলম চৌধুরী, হাসান আশিক তাইমুর ইসলাম, হাসান রেজা মহিদুল ইসলাম, খালেদ মাহমুদ, এম সাজ্জাদ আলম, মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী, মোস্তফা আমির ফয়সাল, রিফাত আলী ভুঁইয়া, সালিমুল হক ঈসা/হাকিম মোহাম্মদ ঈসা, সৈয়দ এ কে আনোয়ারুজ্জামান/সৈয়দ কামরুজ্জামান, সৈয়দ সালমান মাসুদ, সৈয়দ সাইমুল হক, আবদুল হাই সরকার, আহমেদ সামীর পাশা, ফাহমিদা শবনম চৈতি, মো. আবুল কালাম, ফাতেমা বেগম কামাল, মোহাম্মদ আল রুমান খান, মায়নুল হক সিদ্দিকী, মুনিয়া আওয়ান, সাদিক হোসেন মো. শাকিল, আবদুল্লাহ মামুন মারুফ, মোহাম্মদ আরমান হোসেন, মোহাম্মদ শওকত হোসেন সিদ্দিকী, মোস্তফা জামাল নাসের, আহমেদ ইমরান চৌধুরী, বিল্লাল হোসেন, এম এ হাশেম, মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন চৌধুরী, নাতাশা নূর মুমু, সৈয়দ মিজান মোহাম্মদ আবু হানিফ সিদ্দিকী, সায়েদা দুররাক সিনদা জারা, আহমেদ ইফজাল চৌধুরী, ফারহানা মোনেম, ফারজানা আনজুম খান, কে এইচ মশিউর রহমান, এম এ সালাম, মো. আলী হোসেন, মোহাম্মদ ইমদাদুল হক ভরসা, মোহাম্মদ ইমরান, মোহাম্মদ রোহেন কবীর, মনজিলা মোর্শেদ, মোহাম্মদ সানাউল্যাহ চৌধুরী, মোহাম্মদ সরফুল ইসলাম, সৈয়দ রফিকুল আলম ও আনিসুজ্জামান চৌধুরী। অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের পেশাগত পরিচয় প্রকাশ করেনি দুদক।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ’ এবং ইউরোপীয় সংগঠন ‘ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৫৯ জন বাংলাদেশির নামে দুবাইয়ে ক্রয় করা প্রপার্টির কাগজে-কলমে মূল্য ৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

এর আগে ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিলে তথ্য-উপাত্ত জানতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও চিঠি দিয়েছিল দুদক। আর ওই বছরের ১০ এপ্রিল এই সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করে দুদক। ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট থেকে দুবাইয়ে অবস্থানরত ৪৫৯ বাংলাদেশি নাগরিকের সম্পদ কেনার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করতে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগের বিষয়ে দুদকসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশ্যে-গোপনে বিপুল পরিমাণ মূলধন স্থানান্তরিত হচ্ছে দুবাইয়ে। এই অর্থ পুনর্বিনিয়োগে ফুলে ফেঁপে উঠছে দুবাইয়ের আর্থিক, ভূসম্পত্তি ও আবাসনসহ (রিয়েল এস্টেট) বিভিন্ন খাত। ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৫৯ জন বাংলাদেশিদের মালিকানায় সেখানে মোট ৯৭২টি প্রপার্টি কেনার তথ্য রয়েছে। কাগজে-কলমে যার মূল্য সাড়ে ৩১ কোটি ডলার। তবে প্রকৃতপক্ষে এসব সম্পত্তি কিনতে ক্রেতাদের ব্যয়ের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে।

সম্পত্তি ক্রয়ের প্রবনতা বৃদ্ধি

অভিযোগ সূত্র বলছে, গত দুই বছরে দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের প্রপার্টি কেনার প্রবণতা ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি কিনেছেন বাংলাদেশিরা, যার তথ্য তারা দেশে পুরোপুরি গোপন করেছেন। এমনকি বৈশ্বিক নেতিবাচক অর্থনীতির মধ্যেও দেশটির রিয়েল এস্টেট খাতের বিদেশি প্রপার্টি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশিরা শীর্ষে। এদিক থেকে নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, চীন ও জার্মানির মতো দেশগুলোর বাসিন্দাদের পেছনে ফেলেছেন বাংলাদেশিরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ ২০২২ সালের মে মাসে তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাচার করা অর্থ দিয়ে আবাসন সম্পদ কেনার বিষয়টি তুলে ধরে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, তথ্য লুকিয়ে ৪৫৯ জন বাংলাদেশি দুবাইয়ে মোট ৯৭২টি আবাসন সম্পদের মালিক হয়েছেন। এজন্য তারা ব্যয় করেছেন ৩১৫ মিলিয়ন ডলার। এসব সম্পদের মধ্যে ৬৪টি দুবাইয়ের অভিজাত এলাকা দুবাই মেরিনা ও ১৯টি পাম জুমেইরাহতে অবস্থিত। যেখানে অন্তত ১০০টি ভিলা ও কমপক্ষে ৫টি ভবনের মালিক বাংলাদেশি বলে জানা গেছে। চার থেকে পাঁচজন বাংলাদেশি প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তির মালিক। যদিও প্রতিবেদনে কারো নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

দুদকের কর্মকর্তাদের মতে, অর্থপাচারের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সরেজমিন অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি। নতুন কমিশনের কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হলে দুবাইয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী দল পাঠানোর উদ্যোগ আবারও নেওয়া হতে পারে

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত