পিডিবির দুর্নীতি: পর্ব-১

দুই দশক একই চেয়ারে জুলফিকার আলী, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

মোঃ আলমগীর হোসেন প্রকাশিত: ১২ আগস্ট ২০২৬ ০৬:৪৭ পিএম

দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার সুযোগকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছে দাপ্তরিক ফাইল আটকে অর্থ আদায়, প্রভাব খাটানো, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ

সরকারি চাকরিতে বদলি-পদায়ন একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই নিয়মের ব্যতিক্রম যেন সৈয়দ জুলফিকার আলী। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একই দপ্তর ও একই ধরনের দায়িত্বে বহাল থাকার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে একাধিক সরকার এসেছে, প্রশাসনে হয়েছে অসংখ্য রদবদল; কিন্তু বদল হয়নি জুলফিকার আলীর কর্মস্থল।

আলোচিত এই কর্মকর্তা সৈয়দ জুলফিকার আলী বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অর্থ পরিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (বহিঃ অর্থ ও ব্যাংক) পদে কর্মরত বলে জানা গেছে।

সৈয়দ জুলফিকার আলী ২০০০ সালের ২০শে জুন সহকারী পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (বিউবো) চাকরিতে যোগদান করেন। পরে, ২০১২ সালের ২১ অক্টোবর উপ-পরিচালক পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

পরবর্তীতে, ২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল অতিরিক্ত পরিচালক পদে তাকে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়। সর্বশেষে, ২০২৪ সালের ২০ মার্চ তাকে অতিরিক্ত পরিচালক পদে পূর্ণ পদোন্নতি দেয়া হয়।

এদিকে, দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার সুযোগকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছে দাপ্তরিক ফাইল আটকে অর্থ আদায়, প্রভাব খাটানো, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কয়েক দফা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলশ্রুতিতে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন জুলফিকার আলী। এনিয়ে বর্তমানে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে।

বিশেষজ্ঞ মহলের ভাষ্যমতে, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব ও প্রশাসনিক রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের  ভাষ্যমতে, দীর্ঘ সময় একই দপ্তরে অবস্থান করলে একটি নির্দিষ্ট বলয় তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের এই অবস্থান তাঁকে দপ্তরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।

ফাইল আটকে অর্থ আদায়

জুলফিকার আলীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—দাপ্তরিক ফাইল আটকে রেখে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ দাবি করা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, তাঁর চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট ফাইল ছাড়তে বিলম্ব করা হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ফাইল, নথি, লেনদেনের তথ্য এবং ভুক্তভোগীদের নির্দিষ্ট বক্তব্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা অনেক কিছু জানি। কিন্তু প্রকাশ্যে কথা বললে চাকরি নিয়ে সমস্যা হতে পারে। তাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলছি।”

অন্য এক কর্মচারীর অভিযোগ, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও অর্থ নেওয়ার বিষয়ে দপ্তরে আলোচনা রয়েছে। এমনকি তাঁর স্ত্রীর নামে একটি ফাউন্ডেশনের কথা বলে অনুদান সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে বলে ওই সূত্র দাবি করেন।

কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তার

সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার কারণে জুলফিকার আলী দপ্তরের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করেছেন। তাঁর অনুমোদন বা সিদ্ধান্তের ওপর বিভিন্ন কাজের গতি অনেকাংশে নির্ভর করে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

তাদের ভাষ্যমতে, জুলফিকার আলীর দীর্ঘদিনের এই অবস্থান তাঁকে দপ্তরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।

তাঁদের দাবি, জুলফিকার আলীর গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর হওয়ায় অতীতে গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি প্রশাসনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছিলেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, তাঁর সঙ্গে বিরোধে জড়ালে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের যোগাযোগ করা হলেও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে শুরু কর্মজীবন

অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় জুলফিকার আলীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয় এই প্রতিবেদকের। নিজের কর্মজীবনের বিষয়ে জুলফিকার জানান, সরকারী চাকরিজীবনের শুরুতে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এর মধ্যে যমুনা গ্রুপ ও কয়েকটি এনজিও প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিজ্ঞতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সেই সময় স্বল্প বেতনে অনেক কষ্ট করে জীবনযাপন করতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সরকারি চাকরির জন্য বিভিন্ন দপ্তরে চেষ্টা চালান এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে চাকরি পান।

সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন; নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি

দ্য ফিন্যান্স টুডের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জুলফিকার আলীর একটি পাঁচতলা বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে বলে স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য। তবে সম্পত্তিটির প্রকৃত মালিকানা, নির্মাণ ব্যয় এবং অর্থের উৎস নিশ্চিত করতে দলিলপত্র, কর নথি, ব্যাংক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড যাচাই করা জরুরি। এই বিষয়ে এফটি টীমের একটি চৌকস দল কাজ করছে।

এদিকে, এই বাড়িটির বিষয়ে জানতে চাইলে জুলফিকার আলী নিজেকে কেয়ারটেকার হিসেবে পরিচয় দেন প্রতিবেদকের দাবি। পরে কথোপকথনের একপর্যায়ে সেটি তাঁর নিজের বাড়ি বলে স্বীকার করেছেন—এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।

তবে শুধু একটি বাড়ির উপস্থিতি দিয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রশ্ন হচ্ছে—বাড়িটি নির্মাণে অর্থের উৎস কী, সম্পত্তিটি তাঁর নিজের নামে নাকি অন্য কারও নামে, এবং তাঁর ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।

অনুসন্ধানে তাঁর নামে-বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, চাকরিতে যোগদানের আগে বা পরে তাঁর দৃশ্যমান কোনো বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না। ফলে তাঁর ঘোষিত আয়, সম্পদ বিবরণী ও বাস্তব সম্পদের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘদিন সরকারি চাকরি করার পাশাপাশি বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের মতে, জুলফিকার আলীর আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ভবনের দলিল এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দেশের বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। ফলে এই খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় থাকে না; এর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

জুলফিকার আলীর বক্তব্য

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে সৈয়দ জুলফিকার আলী তাঁর কর্মজীবন ও সম্পদসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করা হলে তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তিনি বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টাও করেন বলে দাবি করেছেন এও প্রতিবেদক।

সৈয়দ জুলফিকার আলীর নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে অভিযোগ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। তাই তাঁর সম্পদের প্রকৃত উৎস, আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য এবং দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

প্রশ্ন এখন একটাই—সরকারি চাকরি ও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তাঁর দৃশ্যমান সম্পদের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে?

চলবে…

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত