প্রশ্নটি শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু ঢাকার দুই কোটির বেশি মানুষের শহরে এর উত্তর অত্যন্ত কঠিন। কারণ পানি শুধু পান করার জন্য নয়। পানি দিয়ে রান্না হয়, গোসল হয়, কাপড় ধোয়া হয়, বাসন পরিষ্কার হয়, বাথরুম ও টয়লেট ব্যবহার করা হয়, শিশু ও বয়স্কদের পরিচর্যা করা হয়। একটি বহুতল ভবনে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যে অস্বস্তি শুরু হয়, তা একসময় স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সংকটে পরিণত হয়।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, পানি সংকটের অর্থ শুধু পানির সংকট নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত—ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন। পানি না থাকলে মানুষ শুধু তৃষ্ণার্ত হয় না; তার দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা ব্যাহত হয়, টয়লেট ও বাথরুম ব্যবহারে সমস্যা হয়, রান্না ও খাবার প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়ে।
তাই রাজধানীর কোনো এলাকায় দিনের পর দিন পানি না থাকাকে নিছক স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নগর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা, অবকাঠামো, জনস্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি জবাবদিহির প্রশ্ন।
ঢাকা: ১৯৬৩ আর ২০২৬ এক নয়
ঢাকা ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৩ সালের ৭ নভেম্বর। তখন ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৮৫ লাখ। দৈনিক পানির চাহিদা ছিল প্রায় ১৫ কোটি লিটার এবং সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১৩ কোটি লিটার। অর্থাৎ তখনও ঘাটতি ছিল। কিন্তু শহরের জনসংখ্যা, আয়তন ও অবকাঠামোর সঙ্গে সমস্যাটির মাত্রা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আজকের ঢাকা সেই ঢাকা নয়। ২০২৬ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় দৈনিক পানির চাহিদা ৩২০ থেকে ৩২৫ কোটি লিটার বলে জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ ছয় দশকের কিছু বেশি সময়ে দৈনিক পানির চাহিদা ১৫ কোটি লিটার থেকে বেড়ে ৩২০–৩২৫ কোটি লিটারে পৌঁছেছে।
শুধু মানুষ বাড়েনি। বদলে গেছে শহরের কাঠামোও। একতলা-দোতলা বাড়ির জায়গায় এসেছে ১০, ১৫, ২০ তলা ভবন। একটি ভবনে এখন থাকতে পারে শতাধিক পরিবার। একই পানির সংযোগের ওপর নির্ভর করছেন কয়েক শ মানুষ।
তাই আজকের প্রশ্ন শুধু—ঢাকা ওয়াসা কত পানি উৎপাদন করে? প্রশ্ন হওয়া উচিত—
কত পানি উৎপাদন হয়, কত পানি বিতরণ করা হয়, কত পানি পথে হারিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত নাগরিকের কলের মুখে কতটা নির্ভরযোগ্য পানি পৌঁছায়?
পানি উৎপাদন আর পানি পাওয়া—এক কথা নয়
ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ অবকাঠামো গত কয়েক দশকে বেড়েছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, তাদের পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক প্রায় ৫,১০০ কিলোমিটার। একই সময়ে ছিল ৩৮টি ওভারহেড ট্যাংক, পাঁচটি পানি শোধনাগার এবং এক হাজারের বেশি গভীর নলকূপ।
অর্থাৎ অবকাঠামো নেই—এ কথা বলা যাবে না। নতুন পানি শোধনাগার হয়েছে, বড় প্রকল্প হয়েছে, ভূ-পৃষ্ঠের জল ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পদ্মা ও গন্ধর্বপুরের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও রয়েছে।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নটি—শোধনাগারে পানি তৈরি হলেই কি নাগরিকের কল পর্যন্ত পানি পৌঁছে যায়? উত্তর—সব সময় নয়। একটি আধুনিক পানি সরবরাহব্যবস্থা শুধু পানি উৎপাদনের কারখানা নয়। এর সঙ্গে জড়িত ট্রান্সমিশন লাইন, পাম্পিং স্টেশন, রিজার্ভার, প্রেশার ব্যবস্থাপনা, জোনিং, লিকেজ কন্ট্রোল এবং শেষ প্রান্তের ডেলিভারি। অর্থাৎ একটি শোধনাগার আধুনিক হলেই পুরো শহরের পানি সরবরাহব্যবস্থা আধুনিক হয়ে যায় না। নাগরিকের কাছে শেষ বিচারের মাপকাঠি খুব সহজ: কল খুললে পানি আসে কি না।
৩৮টি ওভারহেড ট্যাংক—দুই কোটির বেশি মানুষের শহরের জন্য? ঢাকা ওয়াসার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরেও ওভারহেড ট্যাংকের সংখ্যা ছিল ৩৮টি। আগের কয়েক বছরের তথ্যেও একই সংখ্যা দেখা যায়।
শুধু ট্যাংকের সংখ্যা দিয়ে অবশ্য একটি শহরের পানি সরবরাহের সক্ষমতা বিচার করা যায় না। ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার, পাম্পিং স্টেশন, ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক, প্রেশার জোন—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু প্রশ্নটি তবু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ঢাকা যখন ক্রমেই ঘনবসতিপূর্ণ ও vertical city হয়ে উঠছে, তখন তার পানি সরবরাহব্যবস্থার buffer capacity ও emergency resilience কি একই গতিতে বাড়ছে?
কারণ একটি বহুতল ভবনে পানি পৌঁছানো আর একটি একতলা বাড়িতে পানি পৌঁছানো এক বিষয় নয়। পানির চাপ কমে গেলে নিচের তলায় হয়তো পানি থাকবে, কিন্তু ওপরের তলায় থাকবে না। তখন ওয়াসার হিসাব বলবে—“এলাকায় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।” আর ভবনের বাসিন্দা বলবেন— “আমাদের বাসায় পানি নেই।” দুটিই একই সঙ্গে সত্য হতে পারে।
পানি আছে, তবু পানি নেই
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী পানি সংকটের খবর প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ব কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার বাসিন্দারা প্রায় দুই মাস ধরে পানি সংকটে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে এসেছে। রান্না, গোসল ও কাপড় ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়েছে। অনেকে ট্যাংকারের পানি কিনেছেন; কোথাও কোথাও ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করার কথাও এসেছে।
এখানে “পানি সংকট” শব্দটি যথেষ্ট নয়। এটি আসলে জীবনযাত্রার সংকট। কারণ পানি না থাকলে মানুষ শুধু তৃষ্ণার্ত হয় না। বাথরুম অচল হয়ে পড়ে, টয়লেট পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়, গোসল বন্ধ থাকে, রান্নাঘরে বাসন জমে যায়, কাপড় ধোয়া যায় না, শিশুদের পরিচ্ছন্নতা ব্যাহত হয় এবং বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে।
অর্থাৎ পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিবারের Hygiene ও Sanitation ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের Dignity—মর্যাদাপূর্ণভাবে জীবনযাপনের অধিকার।
একজন মানুষ নিয়মিত গোসল করতে পারছেন না, টয়লেট পরিষ্কার রাখতে পারছেন না, শিশুদের পরিচ্ছন্ন রাখতে পারছেন না, রান্নাঘর স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে পারছেন না—এটি কেবল অস্বস্তি নয়; এটি তার জীবনযাপনের মান ও মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।
পানি শুধু তৃষ্ণা মেটায় না; পানি মানুষের পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য এবং মর্যাদা রক্ষা করে। তাহলে প্রশ্ন হলো—এই ক্ষতির কোনো হিসাব কি ওয়াসার Annual Report-এ থাকে?
পানি না থাকলে ট্যাংকারই কি সমাধান? ট্যাংকার একটি জরুরি ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু একটি মহানগরের নিয়মিত পানি সরবরাহের বিকল্প হতে পারে না। একটি ১৫ তলা ভবনে যদি শতাধিক পরিবার থাকে, প্রতিদিন তাদের প্রয়োজনীয় পানি ট্যাংকারে এনে সরবরাহ করতে হলে কতটি গাড়ি লাগবে? কতবার আসতে হবে? কোথায় পানি সংগ্রহ হবে? কত টাকা খরচ হবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সব পরিবার কি সেই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে পারবে? পানির সংকটে ধনী পরিবার হয়তো ট্যাংকার কিনতে পারবে। মধ্যবিত্ত কিছুটা পারবে। কিন্তু নিম্নআয়ের মানুষের কী হবে?
তাই পানি সংকট শুধু নগর-সেবার সমস্যা নয়। এটি সামাজিক বৈষম্যের সমস্যাও। যার টাকা আছে, সে পানি কিনবে। যার টাকা নেই, সে অপেক্ষা করবে। এভাবে একটি মৌলিক নাগরিক প্রয়োজন ধীরে ধীরে বাজারের পণ্যে পরিণত হয়।
গ্যাসের বিকল্প আছে; পানির নেই , এই জায়গাটিই আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। গ্যাস নেই—LPG cylinder আছে। বিদ্যুৎ নেই—IPS, generator, solar আছে। কিন্তু পানি নেই—কী আছে?
একটি পরিবার বোতলজাত পানি কিনে পান করতে পারে। কিন্তু বোতলজাত পানি দিয়ে কি টয়লেট flush করা যায়? সেই পানি দিয়ে কি শত মানুষের গোসল করা যায়? কাপড় ধোয়া যায়?
রান্নাঘর পরিষ্কার করা যায়? একটি বহুতল ভবনের sanitation system চালানো যায়? না। এই কারণেই পানি অন্য সব utility থেকে আলাদা। পানির বিকল্প ব্যবস্থা একটি ব্যক্তিগত পরিবার তৈরি করতে পারে না। পানি সরবরাহের নিশ্চয়তা তাই রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। আর এখানেই Hygiene, Sanitation এবং Dignity-র প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে।
নিরাপদ পানি ছাড়া ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা টেকসই হয় না। পর্যাপ্ত পানি ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা যায় না। আর এই দুটো ব্যাহত হলে মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনও বাধাগ্রস্ত হয়। অতএব পানি কোনো সাধারণ utility নয়; এটি একটি সুস্থ, পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ নগরজীবনের পূর্বশর্ত।
নাগরিক রাস্তা কাটলে খড়্গ, কিন্তু সেবার ব্যর্থতার দায়? এখানে এসে আরেকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে। একজন নাগরিক নিজের পানি সংযোগে সমস্যা হলে নিজে থেকে রাস্তা কাটতে পারেন না। অনুমতি নিতে হয়। নির্ধারিত ফি দিতে হয়। নিয়ম মানতে হয়। অনুমতি ছাড়া রাস্তা কাটলে জরিমানাও হতে পারে। এটি যৌক্তিক। রাস্তা জনগণের সম্পদ; underground utility রক্ষা করা দরকার। কিন্তু একই নিয়ম রাষ্ট্রীয় সংস্থার ক্ষেত্রেও যে প্রযোজ্য, তার উদাহরণও আছে।
২০২৪ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অনুমতি ছাড়া রাস্তা কাটার অভিযোগে ঢাকা ওয়াসাকে ১৩ লাখ ৭১ হাজার ৩৯২ টাকা জরিমানা করেছিল। পরে ওয়াসা সেই জরিমানা পরিশোধ করে। এখানে প্রশ্নটি নাগরিককে রাস্তা কাটার অনুমতি দেওয়া উচিত কি না—তা নয়।
প্রশ্নটি হলো— নাগরিকের ওপর যদি নিয়মের খড়্গ নামে, সেবাদাতার ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও কি সমান শক্তির জবাবদিহির খড়্গ নামে? একজন বাড়ির মালিক অনুমতি ছাড়া রাস্তা কাটলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু কোনো এলাকায় দিনের পর দিন পানি না থাকলে? একটি পরিবারকে বাড়তি টাকা দিয়ে পানি কিনতে হলে? একজন কর্মজীবী মানুষকে গভীর রাতে পানি সংগ্রহ করতে হলে? একজন গৃহিণীকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি সংগ্রহে ব্যয় করতে হলে?
এই ক্ষতির দায় কার? বিলের হিসাব আছে, ভোগান্তির হিসাব নেই -নাগরিক পানি বিল দেন। বিল বকেয়া থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কিন্তু পানি না পাওয়ার দিনের হিসাব কে রাখে? নাগরিকের বিলের প্রতিটি টাকা হিসাবযোগ্য। তাহলে নাগরিকের প্রাপ্য সেবার ঘাটতিও কি হিসাবযোগ্য হওয়া উচিত নয়? একটি আধুনিক পানি সরবরাহব্যবস্থায় কিছু প্রশ্নের উত্তর নাগরিকের জানার অধিকার থাকা উচিত:
কোন এলাকায় কত ঘণ্টা পানি সরবরাহ হচ্ছে? কোথায় pressure কম? কোথায় pipeline failure? কখন মেরামত হবে? কোন zone-এ emergency tanker প্রস্তুত আছে? কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টার বেশি পানি না থাকলে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত response time কত? এসব তথ্য কি নাগরিক real-time দেখতে পারেন? যদি না পারেন, তাহলে পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ করার সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা বদলেছে; পানি ব্যবস্থাপনাও কি বদলেছে? ঢাকা ওয়াসার বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ করাই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। প্রতিষ্ঠানটি গত ছয় দশকে পানি শোধন, গভীর নলকূপ, নতুন pipeline এবং বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। surface water-এর দিকে যাওয়ার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নগর ব্যবস্থাপনার সাফল্য শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের সংখ্যায় নয়—সেবার নির্ভরযোগ্যতায়। একটি শোধনাগারের capacity বড় হতে পারে। একটি pipeline network হাজার হাজার কিলোমিটার হতে পারে।
কিন্তু নাগরিকের কল যদি নির্ধারিত সময়ে পানি না পায়, তাহলে সেই ব্যবস্থার শেষ প্রান্তে সমস্যা থেকেই যায়। তাই ঢাকা ওয়াসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শুধু “আরও পানি উৎপাদন” নয়, প্রয়োজন—আরও নির্ভরযোগ্য distribution, প্রয়োজন zone-wise pressure management,প্রয়োজন leakage ও system loss কমানো, প্রয়োজন বহুতল ভবনভিত্তিক demand assessment,প্রয়োজন emergency water protocol,প্রয়োজন real-time public information,আর সর্বোপরি প্রয়োজন— accountability।
আমরা নাগরিককে প্রশ্ন করি— বিল দিয়েছেন? অনুমতি নিয়েছেন? রাস্তা কেন কাটলেন? ফি দিয়েছেন? নিয়ম মানলেন তো? এসব প্রশ্ন থাকবে।
কিন্তু নাগরিকও প্রশ্ন করতে পারেন— আমি বিল দিয়েছি—পানি কোথায়? আমি নিয়ম মেনেছি—সেবা কোথায়? আমি অপেক্ষা করেছি—সমাধান কোথায়? আমি পানি কিনেছি—এই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় কার?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—২০২৬ সালে ঢাকার একজন নাগরিককে কেন নিয়মিত পানির জন্য ট্যাংকারের অপেক্ষা করতে হবে? ঢাকা ওয়াসার বয়স ৬৩ বছর -১৯৬৩ সালের ঢাকা আর নেই --শহর বদলেছে--জনসংখ্যা বেড়েছে--বহুতল ভবন বেড়েছে--প্রযুক্তি বদলেছে--পানি শোধন প্রযুক্তি বদলেছে--নতুন প্রকল্প হয়েছে--পানি সরবরাহের নেটওয়ার্কও বড় হয়েছে--এখন বদলাতে হবে আরও একটি জিনিস—জবাবদিহির কাঠামো।
কারণ নাগরিক পানি উৎপাদনের হিসাব পান করেন না--তিনি Annual Report পান করেন না--তিনি প্রকল্পের উদ্বোধনী ফলকও পান করেন না-তিনি শুধু চান—কল খুললে পানি আসুক।
আর যদি দিনের পর দিন কল খুলে শুধু বাতাস বের হয়, তাহলে নাগরিকের মুখ থেকে যে দীর্ঘশ্বাস বের হয়— “পানি ছাড়াই ভালো ছিলাম!” সেটি নিছক বিরক্তি নয়। সেটি একটি মহানগরের নাগরিকের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের সেবা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার সতর্কবার্তা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই খুব সরল: ঢাকা ওয়াসা কি শুধু পানি উৎপাদন করবে, নাকি নাগরিকের কাছে নির্ভরযোগ্য পানি পৌঁছানোর নিশ্চয়তাও দেবে? কারণ পানি কোনো বিলাসিতা নয় -কোনো দয়া নয়--কোনো অতিরিক্ত সুবিধাও নয়। পানি শুধু নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন নয়; নিরাপদ পানি, Hygiene ও Sanitation নিশ্চিত করা একটি মর্যাদাপূর্ণ নগরজীবনের পূর্বশর্ত।
আর সেই প্রয়োজন পূরণ করতে না পারলে সবচেয়ে আধুনিক শোধনাগারও নাগরিকের শুকনো কলের কাছে এসে ছোট হয়ে যায়।