৬৩ বছরেও ঢাকার পানি সরবরাহ নাগরিকের জন্য নিশ্চিত হলো না!

গ্যাসের বিকল্প সিলিন্ডার, পানির বিকল্প কী?

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬ ০১:৪৬ এএম

তিতাসের গ্যাস নেই—সিলিন্ডার কিনুন। বিদ্যুৎ নেই—আইপিএস, জেনারেটর কিংবা সোলার আছে। কিন্তু পানি নেই? পানির বিকল্প কী?

অবশ্যই। আপনার মূল বক্তব্য ও তথ্যগুলো রেখে, প্রথম আলো/যুগান্তরের সংবাদ-ফিচারধর্মী ভঙ্গিতে—অতিরিক্ত আবেগ বা স্লোগান কমিয়ে, তথ্য, নাগরিক ভোগান্তি, প্রশ্ন ও জবাবদিহির দিকটি সামনে রেখে—এভাবে সাজানো যায়। সাম্প্রতিক মিরপুরের পানি সংকট নিয়েও একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে; সেখানে দীর্ঘস্থায়ী সংকট, ট্যাংকারের ওপর নির্ভরতা এবং ওয়াসার সরবরাহ ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে। (Prothom Alo)

গ্যাসের বিকল্প সিলিন্ডার, পানির বিকল্প কী?

৬৩ বছরেও ঢাকার পানি সরবরাহ কেন নির্ভরযোগ্য হলো না

ঢাকায় পানি সরবরাহের সংকট নতুন নয়। তবে রাজধানীর কোনো এলাকায় দিনের পর দিন পানি না থাকলে বিষয়টি আর কেবল একটি এলাকার সমস্যা থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ও নাগরিক সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন।

পানি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া, বাসন পরিষ্কার থেকে শুরু করে টয়লেট ব্যবহার—দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজেই পানি প্রয়োজন। ফলে পানি সরবরাহ ব্যাহত হলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মনিপুর ও আশপাশের এলাকায় পানির সংকট নিয়ে বাসিন্দাদের দুর্ভোগের খবর এসেছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি আসছে, কোথাও আবার দিন-রাত পানি মিলছে না। অনেককে বাইরে থেকে পানি কিনতে হচ্ছে, কেউ কেউ ট্যাংকারের ওপর নির্ভর করছেন। (Prothom Alo)

প্রশ্ন হচ্ছে, ছয় দশকের বেশি সময় ধরে একটি মহানগরের পানি সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনায় এমন সংকট কেন বারবার তৈরি হচ্ছে?

ঢাকা বদলেছে, পানির চাহিদাও বেড়েছে

ঢাকা ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৩ সালের ৭ নভেম্বর। তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৮৫ লাখ। দৈনিক পানির চাহিদা ছিল প্রায় ১৫ কোটি লিটার এবং সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১৩ কোটি লিটার।

ছয় দশকের বেশি সময় পর ঢাকার চেহারা বদলে গেছে। জনসংখ্যা বেড়েছে, তৈরি হয়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন, বেড়েছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। ফলে পানির চাহিদাও বেড়েছে বহুগুণ।

আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় দৈনিক পানির চাহিদা ৩২০ থেকে ৩২৫ কোটি লিটার। অর্থাৎ ১৯৬৩ সালের তুলনায় চাহিদার পরিমাণ বেড়েছে বহুগুণ।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে পানি সরবরাহের অবকাঠামোও অবশ্যই বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু শুধু পানি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হয় না।

কারণ শোধনাগারে পানি উৎপাদন হওয়ার পর সেটি পাইপলাইন, পাম্পিং স্টেশন, রিজার্ভার ও বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকের বাসায় পৌঁছাতে হয়। কোথাও পানির চাপ কম থাকলে, পাইপলাইনে ত্রুটি থাকলে কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে উৎপাদিত পানি থাকলেও নাগরিকের কল শুকনো থাকতে পারে।

পানি উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু নাগরিক পাচ্ছেন কি?

ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক প্রায় ৫,১০০ কিলোমিটার। রয়েছে পানি শোধনাগার, ওভারহেড ট্যাংক এবং বিপুলসংখ্যক গভীর নলকূপ।

অবকাঠামো বিস্তারের এই চিত্র নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নাগরিকের কাছে সেবার মূল্যায়ন হয় অন্য জায়গায়।

কল খুললে পানি আসে কি না—সেটিই শেষ কথা।

একটি বহুতল ভবনে নিচের তলায় পানি থাকলেও ওপরের তলায় নাও থাকতে পারে। পানির চাপ কমে গেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে কর্তৃপক্ষের হিসাবে কোনো এলাকায় পানি সরবরাহ থাকলেও বাস্তবে অনেক বাসিন্দা পানিবঞ্চিত থাকতে পারেন।

এ কারণেই পানি সরবরাহের হিসাব শুধু উৎপাদন দিয়ে করলে চলবে না। জানতে হবে—কত পানি উৎপাদিত হচ্ছে, কতটা বিতরণ হচ্ছে, কোথায় ঘাটতি হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের কাছে কতটা পানি পৌঁছাচ্ছে।

মিরপুরের সংকট যে প্রশ্ন সামনে আনছে

সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট তীব্র হয়েছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে শেওড়াপাড়া, মনিপুর ও মিরপুর-১১ নম্বর এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগের কথা উঠে এসেছে। কোথাও দিন-রাত পানি না থাকার কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা। এমনকি পানির দাবিতে শেওড়াপাড়ায় শতাধিক মানুষ সড়ক অবরোধও করেছিলেন। (Prothom Alo)

ওয়াসার পক্ষ থেকে সংকটের পেছনে ভাকুর্তা পানি শোধনাগারের যান্ত্রিক ত্রুটি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং চাহিদা বৃদ্ধির মতো কারণের কথা বলা হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় রেশনিং, নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন ও পুরোনো নলকূপ প্রতিস্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি। (Prothom Alo)

অন্যদিকে, পূর্ব কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে পানি সংকট চলার খবরও এসেছে। বাসিন্দাদের কেউ পানি কিনছেন, কেউ ট্যাংকারের ওপর নির্ভর করছেন। ট্যাংকারের পানির জন্য ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। (The Daily Star)

এই পরিস্থিতি শুধু পানির সংকট নয়; এটি একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সংকট।

ট্যাংকার কি সমাধান?

জরুরি পরিস্থিতিতে ট্যাংকারের পানি অবশ্যই প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত পানি সরবরাহের বিকল্প হিসেবে ট্যাংকার কোনো টেকসই সমাধান নয়।

একটি বহুতল ভবনে যদি শতাধিক পরিবার থাকে, তাদের প্রতিদিনের পানি ট্যাংকারে সরবরাহ করতে হলে বিপুল সংখ্যক গাড়ির প্রয়োজন হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বাড়তি খরচ, সময় এবং ব্যবস্থাপনার জটিলতা।

সবচেয়ে বড় বিষয়, অতিরিক্ত এই ব্যয় সবাই বহন করতে পারবেন না।

ফলে পানি সংকট ধীরে ধীরে সামাজিক বৈষম্যেরও কারণ হয়ে উঠতে পারে। যার সামর্থ্য আছে, তিনি পানি কিনতে পারবেন। যার নেই, তাঁকে অপেক্ষা করতে হবে।

এখানেই প্রশ্ন—একটি মৌলিক নাগরিক সেবা কি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে?

গ্যাসের বিকল্প আছে, বিদ্যুতের বিকল্প আছে—পানির?

গ্যাসের সমস্যা হলে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা যায়। বিদ্যুৎ না থাকলে আইপিএস, জেনারেটর কিংবা সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যায়।

কিন্তু পানি না থাকলে একটি পরিবার কতটা বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারে?

পান করার জন্য বোতলজাত পানি কেনা সম্ভব। কিন্তু সেই পানি দিয়ে কি প্রতিদিনের গোসল, কাপড় ধোয়া, রান্নাঘর পরিষ্কার কিংবা একটি বহুতল ভবনের স্যানিটেশন ব্যবস্থা চালানো সম্ভব?

সম্ভব নয়।

এই কারণে পানি অন্য অনেক নাগরিক সেবা থেকে আলাদা। পানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব ব্যক্তির নয়; এটি নগর কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব।

নাগরিকের ভোগান্তির হিসাব কোথায়?

নাগরিক পানি বিল দেন। বিল বকেয়া থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু কোনো এলাকায় দিনের পর দিন পানি না থাকলে সেই ভোগান্তির হিসাব কে রাখে?

একজন কর্মজীবী মানুষকে যদি প্রতিদিন পানি সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়, একজন গৃহিণীকে যদি কয়েক ঘণ্টা পানি সংগ্রহে কাটাতে হয়, অথবা কোনো পরিবারকে যদি নিয়মিত পানি কিনতে হয়—এই বাড়তি সময় ও অর্থের দায় কার?

পানি সরবরাহব্যবস্থায় নাগরিকের জানার অধিকার থাকা উচিত—

কোন এলাকায় কত ঘণ্টা পানি সরবরাহ হচ্ছে?

কোথায় পানির চাপ কম?

কোথায় পাইপলাইনে সমস্যা?

কত সময়ের মধ্যে মেরামত হবে?

কোন এলাকায় জরুরি ট্যাংকার প্রস্তুত আছে?

দীর্ঘ সময় পানি না থাকলে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সাড়া দেওয়ার সময় কত?

এই তথ্যগুলো নাগরিকের কাছে সহজে পৌঁছানো গেলে একদিকে যেমন মানুষের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিও বাড়বে।

শুধু নতুন প্রকল্প নয়, দরকার কার্যকর ব্যবস্থাপনা

ঢাকা ওয়াসা গত কয়েক দশকে পানি শোধনাগার, গভীর নলকূপ, পাইপলাইনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। ভূ-পৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

তবে একটি নগরীর পানি সরবরাহব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতগুলো প্রকল্প হয়েছে, কত কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো হয়েছে কিংবা কত পানি উৎপাদন হচ্ছে—তা দিয়ে বিচার করা যায় না।

বিচার করতে হবে নাগরিকের অভিজ্ঞতা দিয়ে।

একটি আধুনিক পানি সরবরাহব্যবস্থায় প্রয়োজন পর্যাপ্ত উৎপাদনের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিতরণব্যবস্থা, পানির চাপ নিয়ন্ত্রণ, পাইপলাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, লিকেজ কমানো, বহুতল ভবনের বাড়তি চাহিদা বিবেচনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে নাগরিককে নিয়মিত তথ্য জানানোও জরুরি।

জবাবদিহির প্রশ্নটি এড়ানো যাবে না

ঢাকা ওয়াসার বয়স ৬৩ বছর। এই সময়ে ঢাকা শহর বদলে গেছে। জনসংখ্যা বেড়েছে, নগরায়ণ হয়েছে, বহুতল ভবন বেড়েছে, পানির চাহিদা বেড়েছে।

সুতরাং পানি সরবরাহব্যবস্থাকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও আধুনিক, নির্ভরযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।

নাগরিককে যেমন বিল দিতে হয়, নিয়ম মানতে হয়, অনুমতি ছাড়া রাস্তা কাটলে জবাবদিহি করতে হয়—সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকেও তেমনি সেবা না দিতে পারার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।

কারণ নাগরিকের প্রশ্ন খুবই সরল—

বিল দিয়েছি, পানি কোথায়?
নিয়ম মেনেছি, সেবা কোথায়?
অপেক্ষা করেছি, সমাধান কোথায়?
পানি কিনেছি, বাড়তি খরচের দায় কার?

শেষ কথা

ঢাকার পানি সংকটের সমাধান শুধু আরও পানি উৎপাদনে নয়। প্রয়োজন উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন।

কোথায় চাহিদা কত, কোথায় সরবরাহ কম, কোথায় পানির চাপ কমছে, কোথায় পাইপলাইন পুরোনো, কোথায় নতুন অবকাঠামো দরকার—এসবের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নাগরিককে বাস্তব তথ্য জানানো এবং সংকটের সময় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

কারণ একজন নাগরিক ঢাকা ওয়াসার Annual Report পড়েন না। তিনি পানি উৎপাদনের পরিসংখ্যানও পান করেন না। তিনি শুধু চান—কল খুললে পানি আসুক।

আর যদি দিনের পর দিন কল খুলে পানি না আসে, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; সেটি একটি মহানগরের পানি ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবার মান নিয়ে বড় প্রশ্ন।

গ্যাসের বিকল্প সিলিন্ডার আছে, বিদ্যুতের বিকল্পও আছে। কিন্তু পানির বিকল্প নেই। তাই ঢাকার মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য পানি পৌঁছে দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি নাগরিক সেবার মৌলিক দায়িত্ব।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত