রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার: দলের নেতাদের নিয়ে আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত
ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা শেখ হাসিনার
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে বাংলাদেশ কীভাবে মোকাবিলা করে, তা পরখ করতেই মূলত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে তিনি স্বদেশে ফিরে আদালতে হাজির হতে চান বলে জানিয়েছেন
মৃত্যুদণ্ডের সাজা মাথায় নিয়ে প্রায় দুই বছরের নির্বাসন শেষে আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী এই রাজনীতিক তার এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। টেলিফোনে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় বৃহস্পতিবার রাতে। রয়টার্স এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে শুক্রবার।
রয়টার্স জানিয়েছে, দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা একটি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এই প্রথম তার দেশে ফেরার একটি সম্ভাব্য সময়সীমা ঘোষণা করলেন। দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে বাংলাদেশ কীভাবে মোকাবিলা করে, তা পরখ করতেই মূলত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে তিনি স্বদেশে ফিরে আদালতে হাজির হতে চান বলে জানিয়েছেন।
তিনি জানান, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলা হতে পারে জেনেই তিনি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শেখ হাসিনার ভাষায়, ‘নেতাকর্মীরা চরম নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যুও আসে, আমি চাই তা আমার নিজের মাটিতেই হোক, যেখানে আমার বাবা-মায়ের কবর রয়েছে এবং তাদের রক্ত ঝরেছে।’
শেখ হাসিনার এই প্রত্যর্পণ পরিকল্পনা পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে, নির্বাসনে যাওয়ার পর এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও, এবারই প্রথম কোনো সরাসরি সাক্ষাৎকার দিলেন শেখ হাসিনা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা এই প্রধানমন্ত্রী। এরপর থেকেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কাছে বারবার দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকার বর্তমান সরকার। এই প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, কর্তৃপক্ষ তাকে ফিরিয়ে নিতে চায় এবং এ জন্য ভারতকে বারবার চিঠি দিচ্ছে। তবে তিনি নিজেই দেশে ফিরে যাবেন। তার এই প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
দলের প্রায় সব স্তরের নেতাকর্মীদের নামে মামলা হয়েছে এবং অনেকেই আত্মগোপনে আছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা জানান, তিনি দেশে ফিরে দলের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে বর্তমান আদালত কতটা 'প্রহসনমূলক', তা তিনি দেশের মানুষের সামনে প্রমাণ করতে চান। তবে ঠিক কবে বা কোন আদালতে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ করেননি। শেখ হাসিনার পাশাপাশি ভারতে নির্বাসিত আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশে ফেরার বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি জানিয়ে ক্ষমতাচ্যুত এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার বা ন্যায়বিচার নিয়ে কোনো গোপন আলোচনা হতে পারে না। দীর্ঘদিন দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের ভুলত্রুটি হতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, সরকারের ভালো-মন্দ বা ঠিক-ভুল বিচারের অধিকার কেবল জনগণের। সেই বিচারের ভার তিনি দেশের মানুষের ওপরই ছেড়ে দিতে চান।
বর্তমানে ভারতে বসে দল গোছানোর কাজ করছেন তিনি। আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করতে এরই মধ্যে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টির নেতাদের সঙ্গে তিনি অনলাইনে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে তার দল নিষিদ্ধ থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাকে সাজা দেওয়া হতে পারে বা তিনি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। কিন্তু তার দলকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে? তারা যদি খারাপ কিছু করে থাকেন, তবে তার সিদ্ধান্ত জনগণই নেবে। জেলে যাওয়ার বিষয়ে কোনো ভয় নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, আশির দশকে দেশে ফেরার পর এবং ২০০৭ সালেও তিনি কারাবরণ করেছিলেন।
গত বছরের (২০২৫ সালের) নভেম্বরে গণঅভ্যুত্থানে প্রাণহানির ঘটনায় শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা বরাবরই তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা এই প্রথমবার দেশে ফেরার কোনো সময়সীমা বা পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আনলেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে ঢাকা যখন স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে, তখন শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তার ভারতে অবস্থানের কারণে দুই দেশের মধ্যে যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার ফিরে আসার মধ্য দিয়ে সেই সমীকরণেও পরিবর্তন আসতে পারে।
শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার বা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।
Shamiur Rahman
