‘নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ’, বাতিলের দাবি জামায়াত-এনসিপির

ইসিতে বিএনপির সাবেক নেতার নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ ০৫:১৮ পিএম

গত ২৩ জুলাই সরকার সামসুল আলমকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। এরপর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং অতীত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সাবেক সদস্য সামসুল আলমের এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি বিএনপির সম্ভাব্য ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অংশ। অন্যদিকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এই নিয়োগ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও জনআস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গত ২৩ জুলাই সরকার সামসুল আলমকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। এরপর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং অতীত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। তাঁর মতে, এমন একটি নিয়োগ যদি কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তবে তা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যই অশনিসংকেত। তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দলকেও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলিম বলেন, যদি নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী এই নিয়োগ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু অন্য কোনো বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকলে তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।

এই বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই, তাই এ মুহূর্তে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তথ্য পাচারের মামলায় গ্রেপ্তার, পরে বিএনপির রাজনীতিতে

সামসুল আলম ২০১৮ সালের মার্চে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব পদ থেকে অবসরে যান। ওই সময় নির্বাচনী তথ্য পাচারের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি ৬৩ দিন কারাগারে ছিলেন।

কারামুক্তির পর তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের কার্যনির্বাহী কমিটিরও সদস্য ছিলেন।

তবে নিজের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা অস্বীকার না করলেও নতুন দায়িত্বে নিরপেক্ষ থাকার অঙ্গীকার করে সামসুল আলম বলেন, "আমি এখন আর কোনো দল বা মতের নই। আমি একটি নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছি এবং নিরপেক্ষভাবেই দায়িত্ব পালন করব।"

২০১৮ সালের মামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "সেই সময়ের নির্বাচন কেমন হয়েছিল, তা দেশের মানুষ জানে। আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলাম বলেই হয়তো ভোগান্তির শিকার হয়েছিলাম। এখন অতীত ভুলে আমি শুধু নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের দিকেই মনোযোগ দিতে চাই।"

নিয়োগে ইসির কোনো ভূমিকা নেই: কর্মকর্তারা

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সামসুল আলমকে পদায়ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে কমিশনের কোনো ভূমিকা ছিল না।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তিনি এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন এবং ইতোমধ্যে যোগদান করেছেন। তাঁর ভাষায়, "ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় কী ছিল বা ছিল না, সেটি আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়।"

২০১৮ সালের তথ্য পাচারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেটি একটি পৃথক বিষয় এবং বর্তমান নিয়োগের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেন, সরকার কর্তৃক জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী একজন কর্মকর্তা যোগদান করলে কমিশনের তা গ্রহণ করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

নিয়োগ বাতিলের দাবি জামায়াত ও এনসিপির

সামসুল আলমের নিয়োগের প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো সংবেদনশীল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে একটি রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া কমিশনের নিরপেক্ষতা ও জনআস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

তিনি দাবি করেন, এমন নিয়োগ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই অবিলম্বে এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা উচিত।

এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গত ২৬ জুলাই এক বিবৃতিতে জানায়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা অপরিহার্য। দলটির ভাষ্য, সামসুল আলমের নিয়োগ কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে তাঁর নিয়োগ বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে দলটি।

জনআস্থা নিয়েই মূল প্রশ্ন

সামসুল আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের অবস্থানে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, এটি সম্পূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্ত; অন্যদিকে বিরোধী দল ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানো কমিশনের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।

এখন এই নিয়োগকে ঘিরে বিতর্ক কীভাবে শেষ হয় এবং সরকার এই বিষয়ে কোনো পুনর্বিবেচনা করে কি না, সেটিই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত