ক্লিন ইমেজ খুঁজছে হাইকমান্ড

ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা যেকোনো সময়ে

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট ২০২৬ ০৩:১৪ পিএম

সভাপতি-সম্পাদক পদে একাধিক নেতা আলোচনায়, গুরুত্ব পাচ্ছেন ক্লিন ইমেজ ও আন্দোলনে পরীক্ষিত নেতৃত্ব

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। বিএনপির হাইকমান্ড ইতোমধ্যে নতুন নেতৃত্ব চূড়ান্ত করার কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে যেকোনো সময় নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে বলে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও ছাত্রদলের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রগুলোর দাবি, এবার নেতৃত্ব নির্বাচনে সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি (ক্লিন ইমেজ) এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ পাঁচটি পদে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তালিকায় পরিবর্তনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন কমিটির মাধ্যমে ছাত্রদলকে আগামী রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আরও সক্রিয় ও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসিরের নেতৃত্বাধীন কমিটির মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই নতুন নেতৃত্ব গঠন নিয়ে সংগঠনের ভেতরে-বাইরে আলোচনা শুরু হয়। সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক তৎপরতা এবং দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।

আলোচনায় যাঁরা

ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী এর আগে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠনের অভ্যন্তরে তিনি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা হিসেবে পরিচিত।

দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন ইয়াহইয়া। ২০২২ সালের ২৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। মাথায় ১৭টি সেলাই লাগে এবং পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। ২০২৩ সালে বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে গাবতলী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলেন।

এছাড়া ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ছাত্রদলের অন্যতম সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেও শাহবাগ, বাংলামোটর, সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সংগঠনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা জানান। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি নিয়ে কর্মসূচি পরিচালনাতেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের এই নেতা এর আগে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় দুই মাস কারাগারে ছিলেন। পরবর্তীকালে সংগঠন পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করেন। তবে সংগঠনের ভেতরে তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে কয়েকটি বিতর্কের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।

বর্তমান এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসানও শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একাধিক মামলা, হামলা ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। দলীয় সূত্রের দাবি, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এখন পর্যন্ত বড় কোনো বিতর্কে জড়াননি।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহ মো. আদনানও সম্ভাব্য নেতৃত্বের দৌড়ে রয়েছেন। বরগুনা জেলা ছাত্রদল থেকে রাজনীতি শুরু করে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলে সক্রিয় হন। ১/১১-পরবর্তী আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কারণে তাঁকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সহ-সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েলও আলোচনায় রয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দুইবারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় তথ্য অনুযায়ী, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর বিরুদ্ধে আটটি মামলা হয় এবং তিনবার কারাবরণ করতে হয়। সংগঠনের ত্যাগী ও রাজপথের নেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।

ঢাবির বাইরেও কয়েকজন আলোচনায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকেও কয়েকজন নেতার নাম শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে বর্তমান সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এম. রাজীবুল ইসলাম তালুকদার (বিন্দু) উল্লেখযোগ্য।

ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল এর আগে সহ-স্বাস্থ্য সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছিল এবং একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি এফসিপিএস অধ্যয়নরত।

অন্যদিকে কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেতের বিরুদ্ধে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে একাধিক মামলা রয়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, রিমান্ডে নির্যাতনের পাশাপাশি ২০১৫ সালের অবরোধ চলাকালে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে তাঁকে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে তিনি দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এছাড়া সহ-সভাপতি মো. মনজুরুল আলম রিয়াদ, খোরসেদ আলম সোহেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খলিল, মোস্তাফিজুর রহমান এবং ফারুক হোসেনও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছেন।

শেষ মুহূর্তেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা

ছাত্রদলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের মতে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ পদগুলোর জন্য একাধিক নাম বিবেচনায় রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও দলের হাইকমান্ডের অনুমোদনের পরই ঘোষণা করা হবে। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্ভাব্য তালিকায় পরিবর্তনের সুযোগ থাকছে।

নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে এবং আগামী জাতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সংগঠনকে আরও কার্যকরভাবে মাঠে নামানো হবে বলে দলীয় সূত্রে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত