১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪—তিনটি গণঅভ্যুত্থান, তিনটি যুগান্তকারী মোড়
বাংলাদেশের তিন গণঅভ্যুত্থান: ইতিহাসের বাঁকবদলের তিন অধ্যায়
"ইতিহাস কখনো একদিনে রচিত হয় না। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ, সংগ্রাম ও মানুষের স্বপ্ন একসময় বিস্ফোরিত হয়ে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের তিনটি গণঅভ্যুত্থান—১৯৬৯, ১৯৯০ এবং ২০২৪—সেই ধারাবাহিকতারই তিনটি মাইলফলক।"
"ইতিহাস কখনো একদিনে রচিত হয় না। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ, সংগ্রাম ও মানুষের স্বপ্ন একসময় বিস্ফোরিত হয়ে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের তিনটি গণঅভ্যুত্থান—১৯৬৯, ১৯৯০ এবং ২০২৪—সেই ধারাবাহিকতারই তিনটি মাইলফলক।"
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত আন্দোলন, সংগ্রাম ও জনগণের অংশগ্রহণের ইতিহাস। এই ভূখণ্ডে রাষ্ট্রক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো কখনো কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটেনি; বরং বহু ক্ষেত্রে রাজপথে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পাল্টে দিয়েছে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে সুসংহত করেছিল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেয়। আর ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করে।
এই তিনটি গণঅভ্যুত্থান সময়, নেতৃত্ব, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে আলাদা হলেও একটি মৌলিক সত্যে তারা এক—জনগণের সম্মিলিত শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।
১৯৬৯: স্বাধীনতার পূর্বসূচনা
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, শিল্প বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়—সব ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। সরকার ধারণা করেছিল, এই মামলার মাধ্যমে স্বাধিকার আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টোটি।
১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা ঘোষণা করে। এই কর্মসূচি ছয় দফাকে আরও বিস্তৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবির সঙ্গে যুক্ত করে।
২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এরপর ২৪ জানুয়ারি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক—সমাজের প্রায় সব শ্রেণি আন্দোলনে যোগ দেয়।
২২ ফেব্রুয়ারি সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান। একই দিনে তাঁকে "বঙ্গবন্ধু" উপাধি দেওয়া হয়।
গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছেড়ে দেন। যদিও পরবর্তীতে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তবুও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যার পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে।
অনেক গবেষকের মতে, ১৯৬৯ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক জন্মবিন্দু।
১৯৯০: স্বৈরাচারের পতন, গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন।
দীর্ঘ আট বছর ধরে তাঁর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন হলেও আশির দশকের শেষ দিকে তা সর্বাত্মক গণআন্দোলনের রূপ নেয়।
তিনটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোট—আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী জোট—স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এক অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে তোলে।
সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আন্দোলন ছিল এই গণঅভ্যুত্থানের প্রাণশক্তি।
১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর চিকিৎসক ডা. শামসুল আলম খান মিলন পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যু আন্দোলনকে বিস্ফোরণ ঘটায়।
পরবর্তী কয়েক দিনে সারাদেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ধর্মঘট, অবরোধ, গণমিছিল এবং জনতার প্রতিরোধে সরকার চরম চাপে পড়ে।
অবশেষে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগ করেন।
প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। ১৯৯১ সালের অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসে বাংলাদেশ।
২০২৪: জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয় সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
প্রথমদিকে আন্দোলনের মূল দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
জুলাই মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, সহিংসতা, কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি ক্রমেই রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।
৫ আগস্ট ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
২০২৪ সালের এই ঘটনাপ্রবাহকে অনেকেই "জুলাই গণঅভ্যুত্থান" নামে অভিহিত করেন। তবে এর প্রকৃতি, রাজনৈতিক তাৎপর্য, সহিংসতার কারণ, নেতৃত্বের ধরন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনো ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
ইতিহাসের চূড়ান্ত মূল্যায়ন সাধারণত সময়ের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিন গণঅভ্যুত্থানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| বিষয় | ১৯৬৯ | ১৯৯০ | ২০২৪ |
|---|---|---|---|
| সূচনা | ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন | স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন | কোটা সংস্কার আন্দোলন |
| প্রধান বিরোধিতা | পাকিস্তানি সামরিক শাসন | এরশাদের সামরিক শাসন | সমসাময়িক সরকারের নীতি ও রাজনৈতিক সংকট |
| প্রধান শক্তি | ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক | ছাত্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ | শিক্ষার্থী, সাধারণ জনগণ |
| ফলাফল | স্বাধীনতার পথ সুগম | গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা | রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার |
ইতিহাস কী শেখায়?
ইতিহাস বলে, কোনো গণঅভ্যুত্থান একদিনে জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অসন্তোষ, নাগরিক অধিকার সংকট এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা।
বাংলাদেশের প্রতিটি বড় গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু রাষ্ট্র যখন সেই দাবির কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন আন্দোলন বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিয়েছে।
তবে ইতিহাস আরেকটি বিষয়ও মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতার পরিবর্তনই সব সমস্যার সমাধান নয়। গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয় শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
ইতিহাসের বিচার সময়ের হাতে
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানকে আজ স্বাধীনতার পূর্বভূমিকা হিসেবে দেখা হয়। ১৯৯০ সালের আন্দোলন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ঘটনাবলি এখনও ইতিহাসের চলমান অধ্যায়। এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ভবিষ্যতের গবেষণা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হবে।
ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা হলো—এসব ঘটনাকে আবেগ বা দলীয় অবস্থান থেকে নয়, বরং দলিল, তথ্য, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা।
কারণ ইতিহাস কেবল অতীতের গল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের পথনির্দেশকও।
তাই বলা যায়—বিপ্লব কখনো বিদায় বলে না; কেবল একটি সময়ের অবসান ঘটিয়ে আরেকটি সময়ের জন্ম দেয়। আর সেই নতুন সময়ের বিচার শেষ পর্যন্ত ইতিহাসই করে।
লেখক একজন বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক, কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন কর্মী।
Shamiur Rahman
