মির্জা ফখরুলই হচ্ছেন দেশের ২৩-তম রাষ্ট্রপতি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ দুই সূত্র থেকেই বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই দলীয় মহাসচিবের পদ ও মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন তিনি
বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন বলে দলের অভ্যন্তরে প্রবল আলোচনা চলছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা করা না হলেও রাষ্ট্রপতি পদে ঘুরেফিরে তাঁর কথাই বলছেন দলীয় নীতিনির্ধারকরা। যদিও দলীয় সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের সর্বময় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে অর্পণ করেছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিএনপি গতকাল নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র কিনেছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য এখন পর্যন্ত মনোনয়নপত্র না কিনলেও রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জোটের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে জোটের প্রার্থী করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
তবে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিচ্ছে বিএনপি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ দুই সূত্র থেকেই বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই দলীয় মহাসচিবের পদ ও মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন তিনি।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে এসে এই সম্মাননা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাওনাই ছিলো।বিএনপির সবচেয়ে কঠিন সময়ে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই নানা ধরনের ঝড়-ঝাপটা মোকাবেলা করে এগিয়ে গেছে।
দলের জন্য তিনি শুধু একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতাই নন, মীর্জা ফখরুল একই সাথে জিয়া পরিবারের একজন বিশ্বস্ত সহযোগীও বটে।
অনেক ঝানু রাজনীতিবিদদের ডিঙিয়ে মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির মহাসচিব বানিয়েছিলেন। তিনিও বেগম জিয়ার সেই বিশস্ততার পরিচয় দিয়ে গেছেন হাসিনার ফ্যাসিবাদি শাসনামলের দীর্ঘ সময়ে।
এসময় তিনি কখনো দলের নীতি এবং চেয়ারপারসনের কথার বাইরে যাননি। তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন, বেগম জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের পুরো সময় তিনিই বিএনপিকে আগলে রেখেছিলেন নানা ঝড়-ঝাপটা থেকে। একসূতোয় গেথেছিলেন নেতাকর্মীদের। তার শ্রম, প্রজ্ঞা ও দুরদর্শিতার কারণেই দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিলো বিএনপির ভাঙন।
হাসিনার শেষ আমি-ডামি নির্বাচনে বহুভাবে চেষ্টা করেছিল বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে। শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন চালিয়েছে, কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি।
সরকারের পক্ষ থেকে তখন এমনও প্রস্তাব দিয়েছিল যে, আপনারা শুধু রাজি হন নির্বাচনে যেতে, একরাতে সব নেতাকে ছেড়ে দিবো। কিন্তু এতেও কাজ হয়নি। মূলত মীর্জা ফখরুল ইসলামের দৃঢ়চেতা মনোভাব এবং সাহসী অবস্থানের কারণেই সেবার বিএনপির ঐক্যও যেমন অটুট ছিলো তেমনি স্বৈরাচার সরকারের পতনঘন্টাও তখন বেজে গিয়েছিলো।
একান্ত আলাপচারিতায় প্রায়শই মীর্জা ফখরুল ইসলাম বলতেন, কারাপ্রকোষ্ঠে সিনিয়র নেতাদের এমন মানসিক নিপীড়ন করা হতো যা বর্ননা করতে গেলেও গা শিউরে উঠে। প্রায় রাতেই শীর্ষনেতাদের পাশের সেলে এনে কর্মীদের অমানুষিক নির্যাতন করা হতো এবং তাদের গগণবিদারী চিৎকার, আর্তনাদ নেতাদের শোনানো হতো। কর্মীদের কান্নার আওয়াজে নিজেরাও কাঁদতেন, রাত কাটতো নির্ঘুম।
হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে মীর্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা হয় এবং ১১ বার তিনি কারাবরণ করেন। ২০১৮ সালে নির্বাচনে জেতার পরও তিনি সংসদে যাননি। দেশের ইতিহাসে যা নজিরবিহীন এক ঘটনা।

বেগম খালেদা জিয়ার অধ্যায় শেষ হয়ে তারেক রহমানের অধ্যায়ও শুরু হলো ফখরুল সাহেবকে সামনে রেখে।
দেশে ফেরার পর তারেক রহমান উনাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে কখনো কার্পণ্য করেননি। প্রত্যাবর্তনের দিনে সেই ঐতিহাসিক সংবর্ধনায় কথা ছিল একমাত্র তারেক রহমানই বক্তব্য দিবেন। কিন্তু তারেক রহমান মঞ্চে ওঠার পর তার আগে লক্ষ জনতার সামনে মীর্জা ফখরুল ইসলাম সাহেবকেই বক্তৃতা দিতে বললেন।
এখানেই শেষ নয়। পরবর্তীতে, মালয়েশিয়া-চীন সফরে যাওয়ার সময়ও বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবশেষে বিদায় নিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলামের কাছ থেকে। সে সময় তারেক রহমান তার দুই হাত চেপে বলেছিলেন, এখন আপনার দায়িত্বে সবকিছু।
নির্বাচনের আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম ঠাকুরগাঁওয়ে এক পথসভায় জনগণকে বলেছিলেন, এটাই আমার জীবনে শেষ নির্বাচন।
তাই বলা যায়, প্রেসিডেন্ট হওয়ার মাধ্যমে মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ৪ দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি যে একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও সততা বজায় রেখেছিলেন, তাতে শেষ জীবনে এমন সম্মান তারই প্রাপ্য।
উল্লেখ্য, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। পরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। একই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপির এই মহাসচিব বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী দলের মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে তাঁর পরিচিতি আরও বাড়ে। ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি মহাসচিব নির্বাচিত হন।
Shamiur Rahman
