আওয়ামীপন্থীদের পুনর্বাসন ও প্রভাব বিস্তারে জেলা বিএনপির দুই শীর্ষনেতার ইন্ধন ⊕ তৃনমূলে তীব্র ক্ষোভ

টাঙ্গাইল ডায়াবেটিক সমিতির আলোচিত সেই নির্বাচন স্থগিত

শাহীন আব্দুল বারী প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২৬ ০৭:২৮ পিএম

নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, তৃণমূলে ক্ষোভ—অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পুরো প্রক্রিয়া

টাঙ্গাইল ডায়াবেটিক সমিতির কার্যকরী কমিটির বহুল আলোচিত নির্বাচন শেষ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। আগামী ২৯ আগস্ট ভোটগ্রহণের কথা থাকলেও মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) অনিবার্য কারণ দেখিয়ে নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও অভিযোগের মধ্যে আপাতত স্বস্তি ফিরেছে বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও টাঙ্গাইল ডায়াবেটিক সমিতির প্রধান নির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমার মহন্তের স্বাক্ষরিত চিঠিতে নির্বাচন স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে নির্বাচন স্থগিতের নেপথ্যে কী কারণ—তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক পক্ষের অভিযোগ, সমিতির নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছিল। অন্যদিকে, এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত বিএনপি নেতারা।

তফসিল ঘিরে শুরু হয় বিতর্ক

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল ডায়াবেটিক সমিতির কার্যকরী কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরেই জেলা বিএনপির ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়।

অভিযোগ ওঠে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সমিতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশকে রেখেই নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় বিএনপির স্থানীয় দুই প্রভাবশালী নেতা জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীন ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজগর আলীর প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন দলের একাংশের নেতাকর্মী।

তাদের দাবি, প্রথম দফায় নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হলে প্রক্রিয়াটি থেমে যায়। পরে আবারও নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়। সেই তফসিল অনুযায়ী ২৯ আগস্ট ভোটগ্রহণের কথা ছিল।

এরপর জেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছাইদুল হক ছাদু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে লিখিতভাবে নির্বাচন স্থগিতের দাবি জানান। এর মধ্যেই মঙ্গলবার নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত আসে।

‘আওয়ামী দোসরদের পুনর্বাসনের চেষ্টা’—অভিযোগ

বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজন ব্যক্তি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও তাদের জায়গায় নতুনভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তাদের আরও অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময় ধরে সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশকে নতুন কমিটিতেও রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ নিয়ে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠদের প্রভাবের অভিযোগ

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর টাঙ্গাইল ডায়াবেটিক সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটিতে দলটির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন।

অভিযোগ রয়েছে, সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান স্মৃতি। এছাড়া হারুন অর রশীদ ও জাফর আহমেদসহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা দাবি করছেন।

তবে এসব ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় ও দীর্ঘ ১৭ বছর একই কমিটিতে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সমিতির আনুষ্ঠানিক নথি বা হালনাগাদ কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সমিতির সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান

টাঙ্গাইল ডায়াবেটিক সমিতির গুরুত্ব শুধু একটি সামাজিক সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমিতির মাধ্যমে পরিচালিত টাঙ্গাইল ডায়াবেটিক হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে জেলার ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। ১৯৮৭ সালে সমিতির মাধ্যমে হাসপাতালটির যাত্রা শুরু হয়। ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালটির কার্ডধারী রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজার ৪৫৯ জন এবং কার্ডের বাইরে আরও অসংখ্য রোগী সেখানে চিকিৎসা নিতেন। একই প্রতিবেদনে চিকিৎসক সংকটের কথাও উঠে আসে।

সরকারি জেলা তথ্যসূত্রেও টাঙ্গাইল ডায়াবেটিক হাসপাতালকে জেলার বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ফলে সমিতির পরিচালনা পর্ষদে কারা থাকবেন, কীভাবে নির্বাচন হবে এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত হবে—তা নিয়ে রোগী ও সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ রয়েছে।

‘সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করেছেন’—ছাইদুল হক ছাদু

জেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছাইদুল হক ছাদু বলেন, সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক সংবাদ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জেলা বিএনপির সভাপতি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠদের রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, মামলা-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখল-বাণিজ্যসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বিষয়ে দলের হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

তবে ছাইদুল হক ছাদুর এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসানুজ্জামিল শাহীনের বক্তব্য প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।

‘এক নেতার নেতৃত্বে দল চলছে’—তৃণমূলে ক্ষোভ

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে। গত শুক্রবার টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীন দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পত্রিকায় মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কমেন্ট বক্সে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা যায় বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।

বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশের অভিযোগ, জেলা বিএনপিতে একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। তারা দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বৃহত্তর অংশগ্রহণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন।

উন্নয়ন প্রশ্নেও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক কাজী শফিকুর রহমান লিটন বলেন, টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর দাবি, গত ছয় মাসে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে; কিন্তু একটি কুচক্রী মহল ও আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠদের কথিত অপকর্মের কারণে সেই অর্জন ম্লান হচ্ছে।

এই বক্তব্যেরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিমাণ ও ‘অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ’ করার দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন স্থগিত—এখন সামনে কী?

নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এখন মূল প্রশ্ন—নতুন করে কবে তফসিল ঘোষণা হবে এবং কীভাবে একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের দাবি, নির্বাচনের আগে সমিতির বর্তমান ও অতীত কমিটির বৈধতা, সদস্য তালিকা, ভোটার তালিকা, প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা এবং গত কয়েক বছরের প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রকাশ্যে যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, টাঙ্গাইল ডায়াবেটিক সমিতি যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত, তাই এর পরিচালনা কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের চেয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রোগীসেবার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

এদিকে নির্বাচন স্থগিতের পর সংশ্লিষ্ট মহলে এখন অপেক্ষা—নতুন নির্বাচন কমিশন বা বর্তমান কমিশন কীভাবে পরবর্তী নির্বাচনী প্রক্রিয়া সাজায় এবং দীর্ঘদিনের এই বিতর্কের অবসান কীভাবে হয়।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত