আপোষহীন, চিরঅম্লান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

সালাউদ্দিন মিঠু প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২৬ ১২:১৩ পিএম

‘আপোষহীন’—এই একটি শব্দ যেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ব্যক্তিগত শোক, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব কিংবা নানা চাপ—কোনোটিই তাঁকে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে বহু নেতার আবির্ভাব ঘটেছে, আবার সময়ের স্রোতে অনেকেই হারিয়ে গেছেন। কিন্তু ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষায় কিছু মানুষ শুধু টিকে থাকেন না—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির দীর্ঘ সংগ্রামের অন্যতম প্রধান মুখ, আপোষহীনতার প্রতীক এবং বিএনপির লাখো নেতা-কর্মীর কাছে আস্থার কেন্দ্রবিন্দু।

‘আপোষহীন’—এই একটি শব্দ যেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ব্যক্তিগত শোক, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব কিংবা নানা চাপ—কোনোটিই তাঁকে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি।

শোক থেকে রাজনীতির মঞ্চে

১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে। সেই সময় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকা একজন গৃহবধূকে হঠাৎ করেই সামনে আসতে হয় জাতীয় রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায়।

স্বামীর মৃত্যুর পর ব্যক্তিগত শোককে পাশে রেখে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা। তাঁর এই রাজনৈতিক উত্থান ছিল শুধু ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রবেশ নয়; বরং একটি রাজনৈতিক আদর্শ ও দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার গল্প।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দৃঢ় নেতৃত্ব

আশির দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতায় পরিণত করে।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে তিনি রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দেন। গ্রেপ্তার, গৃহবন্দিত্ব, রাজনৈতিক চাপ—কোনোটিই তাঁকে আন্দোলন থেকে সরাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং দেশে গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতাই তাঁকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত করে।

জনগণের ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতায়

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

পরবর্তীতে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির নেতৃত্বে বিপুল বিজয় অর্জন করে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন।

তাঁর সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বেসরকারি খাতের বিকাশ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৈরি পোশাক শিল্পের বিস্তার, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নারী শিক্ষায় নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন নারী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার উত্থান ছিল নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের সময়ে নারী শিক্ষা ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি, নারী শিক্ষার প্রসার এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ দেশের সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে নারীর অংশগ্রহণ আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপোষহীন অবস্থান

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে আলোচিত দিক তাঁর আপোষহীনতা।

বিশেষ করে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক সংকট ও ওয়ান-ইলেভেনের সময় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তাঁকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আইনি সংকট, কারাবাস এবং নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি তাঁর দলীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি।

সমর্থকদের কাছে এই দৃঢ়তাই তাঁকে ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

প্রতিকূলতার মধ্যেও অটুট

রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার পাশাপাশি বিরোধী দলেও কঠিন সময় পার করতে হয়েছে বেগম খালেদা জিয়াকে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ কয়েক দশক নানা মামলা, আন্দোলন, গ্রেপ্তার, কারাবাস ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে।

বিশেষ করে কারাবাসের সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতির বিষয়টি দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়। চিকিৎসার প্রয়োজন, রাজনৈতিক অধিকার এবং তাঁর মুক্তির দাবিতে বিএনপি ও তাঁর সমর্থকেরা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছে।

সমর্থকদের মতে, এসব প্রতিকূলতা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করার পরিবর্তে বরং তাঁর প্রতি দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের আবেগ ও আনুগত্যকে আরও দৃঢ় করেছে।

ক্ষমতার চেয়ে আদর্শ—সমর্থকদের বিশ্বাস

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে তাঁর সমর্থকেরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপন, রাজনৈতিক ত্যাগ এবং দলের প্রতি আনুগত্যকে।

তাঁদের বিশ্বাস, তিনি রাজনীতিকে ব্যক্তিগত সম্পদ বা ক্ষমতা ভোগের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং জনগণের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাঁর তীব্র মতবিরোধ থাকলেও তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেন তাঁর অনুসারীরা।

অন্যদিকে, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মতোই তাঁর শাসনামল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। ইতিহাসে একজন রাষ্ট্রনায়কের মূল্যায়ন যেমন তাঁর অর্জনের ভিত্তিতে হয়, তেমনি বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতাও সেই মূল্যায়নের অংশ। তবে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’

বেগম খালেদা জিয়ার সমর্থকেরা তাঁকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ বা ‘গণতন্ত্রের মা’ হিসেবে অভিহিত করেন। এই উপাধির পেছনে রয়েছে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা।

তাঁর সঙ্গে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সম্পর্কও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলাদা মাত্রা তৈরি করেছে। দলের অসংখ্য নেতা-কর্মী তাঁকে শুধু দলীয় প্রধান হিসেবে নয়, পরিবারের একজন অভিভাবক হিসেবেও দেখেন।

ইতিহাসের পাতায় এক দীর্ঘ অধ্যায়

বয়স, শারীরিক অসুস্থতা, কারাবাস এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতা—সবকিছুর পরও বেগম খালেদা জিয়ার নাম বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

তিনি একই সঙ্গে একজন নারী নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন এবং দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। তাঁর রাজনৈতিক জীবন যেমন অর্জনে সমৃদ্ধ, তেমনি বিতর্ক ও মতপার্থক্যেও পরিপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্বের মধ্যেও তাঁর দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রভাবই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র।

তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—রাজনীতি শুধু ক্ষমতা অর্জনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দায়িত্ব, ত্যাগ, আদর্শ, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার মুখে নিজের অবস্থান ধরে রাখার সাহস।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে তাঁর সময়, কর্মকাণ্ড, সাফল্য, ব্যর্থতা ও বিতর্ক—সবকিছুর সমন্বিত বিচারে মূল্যায়ন করে। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে চিরকাল উচ্চারিত হবে।

তিনি বেগম খালেদা জিয়া—একজন নারী নেত্রী, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সমর্থকদের কাছে আপোষহীন সংগ্রামের প্রতীক।

সময় তাঁকে কতটা কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তার চূড়ান্ত রায় ইতিহাসই দেবে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত