জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষা বিস্তারে মুসলিম নারীর ঐতিহাসিক অবদান

নেহাল আহমেদ প্রকাশিত: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০১:০৬ এএম

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, মিসর

পবিত্র কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ শব্দই ছিল "ইকরা" (পড়ো)। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় থেকেই নারীরা ধর্মীয় জ্ঞান, হাদিস, ফিকহ, চিকিৎসা, সাহিত্য এবং সমাজসেবায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন

ইতিহাসের আলোচনায় মুসলিম সভ্যতার কথা উঠলেই সাধারণত শাসক, যুদ্ধ বা সাম্রাজ্যের প্রসঙ্গ বেশি আসে। অথচ এই সভ্যতার বিকাশে মুসলিম নারীদের অবদানও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, সমাজকল্যাণ, সাহিত্য, ওয়াকফ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহু মুসলিম নারী এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা আজও ইতিহাসে উজ্জ্বল।

ইসলামে জ্ঞান অর্জন নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই উৎসাহিত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ শব্দই ছিল "ইকরা" (পড়ো)। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় থেকেই নারীরা ধর্মীয় জ্ঞান, হাদিস, ফিকহ, চিকিৎসা, সাহিত্য এবং সমাজসেবায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। পরবর্তী শতকগুলোতে অনেক মুসলিম নারী নিজেদের সম্পদ, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাস রচনা করেছেন।

ফাতিমা আল-ফিহরি: বিশ্বের প্রাচীনতম সচল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা

৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর ফেজ শহরে ফাতিমা আল-ফিহরি আল-কারাউইয়িন প্রতিষ্ঠা করেন। ইউনেস্কো ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম ক্রমাগত চালু থাকা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, দর্শন, ভাষা, জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয় পড়ানো হতো। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ তিনি শিক্ষা বিস্তারের জন্য ব্যয় করেছিলেন।

সিত্তুশ শাম ফাতিমা খাতুন

সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বোন সিত্তুশ শাম দ্বাদশ শতকের অন্যতম শিক্ষা-পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি দামেস্কে একাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেগুলোর জন্য বিপুল সম্পদ ওয়াকফ করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়।

সুলতানা রাজিয়া

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম কার্যকর মুসলিম নারী শাসক রাজিয়া সুলতানা (১২৩৬–১২৪০ খ্রি.) প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রজাহিতৈষী মনোভাবের জন্য স্মরণীয়। তাঁর শাসনামলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত ছিল।

আদির কারিমা

ইয়েমেনের শাসক আলী দাউদের মা আদির কারিমা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দক্ষতার সঙ্গে প্রশাসন পরিচালনা করেন। পাশাপাশি তিনি একাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এবং সেগুলোর জন্য স্থায়ী ওয়াকফ সম্পত্তি দান করেন।

তাতার হাজ্জাজিয়্যা

মামলুক আমলের প্রভাবশালী নারী তাতার হাজ্জাজিয়্যা কায়রোতে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যার সঙ্গে মসজিদ, গ্রন্থাগার ও এতিমখানা ছিল। এতিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, খাদ্য ও অন্যান্য ব্যয়ও তিনি বহন করতেন।

খাওয়ান্দ বারাকাহ

মিসরের সুলতান আল-আশরাফ শাবানের মা খাওয়ান্দ বারাকাহ একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং জনকল্যাণে পানীয় জলের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন দাতব্য কাজ পরিচালনা করেন।

নায়েলা খাতুন

উসমানীয় আমলে নায়েলা খাতুন নিজের বাড়ি ও সম্পত্তি ওয়াকফ করে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এই উদ্যোগ শিক্ষা বিস্তারে ওয়াকফের গুরুত্বের একটি অনন্য উদাহরণ।

নানা আসমাউ

উনিশ শতকের পশ্চিম আফ্রিকার প্রখ্যাত আলেমা, কবি ও শিক্ষাবিদ নানা আসমাউ নারীশিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি নারীদের জন্য পাঠচক্র গড়ে তোলেন, সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দেন এবং ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক নেতৃত্ব ও আত্মনির্ভরতার শিক্ষা দেন।

ফাতিমা বিনতে ইসমাইল

মিসরের রাজকুমারী ফাতিমা বিনতে ইসমাইল কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি দান, ভবন নির্মাণে অর্থ সহায়তা এবং মূল্যবান গ্রন্থ উপহার দেন।

রানি ইফফাত

সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সালের সহধর্মিণী রানি ইফফাত আধুনিক সৌদি আরবে নারীশিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত। তাঁর উদ্যোগে তায়েফে প্রথম দিকের আধুনিক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে তাঁর প্রচেষ্টায় দেশটিতে নারীশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠ আমাদের জানায়, মুসলিম নারীরা কেবল পরিবারের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তাঁরা শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, সমাজকল্যাণ, সাহিত্য, রাষ্ট্র পরিচালনা ও মানবসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আজকের মুসলিম নারীর শিক্ষা, গবেষণা ও সমাজ উন্নয়নে অংশগ্রহণ কোনো নতুন ধারণা নয়; বরং তা মুসলিম সভ্যতার দীর্ঘ ও গৌরবময় ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত