হালান্ডের জোড়া গোলে প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে

ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের করুন পরিসমাপ্তি

সামিউর রহমান প্রকাশিত: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০৬:৩১ এএম

এই হারের পর আগামী ৪ বছর ব্রাজিলের সমর্থকদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরবে—কেন দলের সবচেয়ে ধারালো গোলদাতাদের একজন ভিনিসিয়ুসকে দিয়ে পেনাল্টি না নিয়ে ব্রুনো গিমারায়েসকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হলো?

দুর্দান্ত লড়াইয়ে ভরপুর শেষ ১৬'র আজকের ম্যাচে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দিল নরওয়ে। ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন চূর্ণ করে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় মহাকাব্য লিখল নরওয়ে। আর্লিং হালান্ডের দানবীয় পারফরম্যান্সে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার গৌরবময় ইতিহাস গড়ল স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা, আর ৩৬ বছর পর শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে এমন প্রতিপক্ষ খুব বেশি নেই, যাদের বিপক্ষে কখনো জয়ের স্বাদই পায়নি সেলেসাওরা। নরওয়ে সেই বিরল ব্যতিক্রম। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চে সেই অস্বস্তিকর ইতিহাস আরও দীর্ঘ করলেন আর্লিং হালান্ড।

আজকের ম্যাচের আগে চারবার মুখোমুখি হয়েছিলো ব্রাজিল ও নরওয়ে। কিন্তু এই চার দেখায় একবারও জয়ের মুখ দেখেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। নরওয়ে জয় পেয়েছিলো দুটি ম্যাচে, বাকি দুটি ড্র হয়েছিলো সর্বশেষ দুই দলের দেখা হয়েছিল ২০০৬ সালে। সেই ম্যাচটি ১–১ গোলে ড্র হয়েছিল।

এদিকে, ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপ থেকে এত তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে হলো ব্রাজিলকে। অন্যদিকে নরওয়ে গড়েছে নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপে এটিই তাদের সেরা সাফল্য। সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এবার তাদের প্রতিপক্ষ হবে মেক্সিকো কিংবা ইংল্যান্ড। এই ম্যাচে জোড়া গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ৭ গোল করা লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ছুঁয়ে ফেললেন হালান্ড।

ম্যাচ শুরুর আগে আগে জাপান ম্যাচ থেকে ব্রাজিলের একাদশে একটি পরিবর্তন এনেছিলেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। চোটাক্রান্ত লুকাস পাকেতার জায়গায় গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে দলে নেন 'ডন কার্লো'।

খেলা শুরুর পর থেকেই পুরো ম্যাচে একের পর এক দারুণ আক্রমণ করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। কিন্তু প্রতিবারই নরওয়ের গোলরক্ষকের কাছে গিয়ে পরাস্ত হন রায়ান-ভিনিসিয়াস-গুইমারেস-কুনহা-এন্দ্রিকরা। অন্যদিকে নরওয়েও পাল্টা আক্রমন করে গেছে সমানতালে। এভাবেই কেটে যায় ৭৮ মিনিট। পরের দশ মিনিটের গল্পটা আর্লিং হালান্ডের।

গোটা ম্যাচে বলার মতো মাত্র দুটো সুযোগ পেয়েছিলেন হালান্ড৷ আর এই দুটো সুযোগই কাজে লাগিয়ে ব্রাজিলের জালে দুবার বল পাঠান এই ম্যানচেস্টার সিটি তারকা। যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে নেইমার একটি গোল পরিশোধ করলেও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে ব্রাজিলকে হারায় নরওয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে আজ মুখোমুখি হয়েছিলো ব্রাজিল ও নরওয়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনা। ম্যাচের শুরুতেই ব্রাজিলের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলো নর্ডিক দলটি।

ম্যাচ শুরু হওয়ার চার মিনিটের মাথায় ব্রাজিলের জালে বলও পাঠিয়ে দিয়েছিল নরওয়ে। সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো স্টেডিয়াম। কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল করেন রেফারি। তাতেই যেন প্রাণ ফিরে পায় ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা। আলিসনকে ফাঁকি দিয়ে অফসাইডে দেওয়া গোলটি ছিল প্যাটট্রিক বার্গের।

এদিকে ম্যাচের একাদশ মিনিটে লিড নিতে পারতো ব্রাজিল। ১১তম মিনিটে ডি-বক্সের ভেতরে ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে যান ম্যাথউস কুনহা। তবে মুহূর্তেই স্লাইডিং ট্যাকলে তাকে থামিয়ে দেন ক্রিস্টোফার আয়ের। কুনিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে পেনাল্টির জোরালো দাবি করে ব্রাজিল। প্রথমে পেনাল্টির আবেদন নাকচ করলেও পরে ভিএআরের মাধ্যমে ফাউল ঘোষণা করে পেনাল্টি দেন রেফারি।

দলকে এগিয়ে নেওয়ার আদর্শ সুযোগ ছিল সেটি। বল ছিল দলের অন্যতম সেরা গোলদাতা এবং বিশ্বকাপের ৪ ম্যাচে ৪ গোল করে ম্যাচে নামা ভিনিসিয়ুসের হাতেই। দেখে মনে হচ্ছিল তিনিই পেনাল্টি নেবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি নিজে শট না নিয়ে বল তুলে দেন ব্রুনো গিমারায়েসের হাতে। পেনাল্টি কিক নিতে আসেন ব্রুনো গুইমারেস। তার নেওয়া শটটি বীরত্ব দেখিয়ে ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নাইল্যান্ড।

বিশ্বকাপের এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের পরিবর্তে ব্রুনোর পেনাল্টি শট নেয়ার ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হলো সেলেসাওদের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়ার মাধ্যমে। এই হারের পর আগামী ৪ বছর ব্রাজিলের সমর্থকদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরবে—কেন দলের সবচেয়ে ধারালো গোলদাতাদের একজন ভিনিসিয়ুসকে দিয়ে পেনাল্টি না নিয়ে গিমারায়েসকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হলো?

পেনাল্টি মিসের ধাক্কা সামলে প্রথমার্ধের শেষদিকে ম্যাথিউস কুনহা এবং মার্তিনেল্লি দূরপাল্লার শটে গোল করার চেষ্টা করলেও নরওয়ের ডিফেন্ডাররা তা প্রতিহত করেন। ম্যাচের ৪০ মিনিটে আবারও গোলের সুযোগ তৈরি করে ব্রাজিল। ডি বক্সের ভেতর থেকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নেয়া শট সেভ করেন নরওয়ে গোলকিপার। প্রথমার্ধের শেষ দিকে নরওয়ের একটি আক্রমণ ঠেকিয়ে ব্রাজিলকে রক্ষা করেন অ্যালিসনও। এতে গোলশূন্য সমতায় থেকে বিরতিতে যায় দু'দল।

বিরতি থেকে ফিরে গোলের লক্ষ্যে একের পর আক্রমণ করেও গোলের দেখা পায়নি লাতিন আমেরিকান দলটি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই একাদশে দুটি পরিবর্তন আনে নরওয়ে। মাঠে নামেন অস্কার বব ও আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ। অন্যদিকে, ম্যাচের ৫৮তম মিনিটে কুনহা পরিবর্তে এন্দ্রিককে মাঠে নামান কার্লো আনচেলত্তি।

মাঠে নামার প্রথম মিনিটেই গোলের এক সুবর্ণ সুযোগ মিস করেন এই উদীয়মান ব্রাজিলিয়ান তারকা। বামপ্রান্ত থেকে আক্রমণে আসা ভিনিসিয়ুস এক দুর্দান্ত পাস দেন এন্দ্রিককে। বল নিয়ে নরওয়ের বক্সের ভেতরে ঢুকে যান তিনি। সামনে ছিলেন কেবল গোলরক্ষক। টোকা দিয়ে বল জালে জড়াতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বলটি চলে যায় গোলবারের পাশ দিয়ে।

৬২তম মিনিটে বক্সের খানিক বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শট নিয়েছিলেন রায়ান। এবারও নরওয়ের ত্রাতা হয়ে উঠেন গোলরক্ষক নাইল্যান্ড। পরের মিনিটেই দুর্দান্ত এক সুযোগ নষ্ট করেন গুইমারেস।

ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে আসে সেই মাহেদ্রক্ষণ। না, কোনো গোল হয়নি। এসময় বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়র। তার সঙ্গে দানিলোকেও মাঠে নামান কোচ আনচেলত্তি।

পুরো ম্যাচে ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল নরওয়ে। ৭৫ মিনিটে হালান্ডের তৈরি করা সুযোগ থেকে গোলের কাছাকাছি পৌঁছে যায় তারা। এরপর ৭৯ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। নিউজার্সির পুরো স্টেডিয়ামকে যেন স্তব্ধ করে দেন নরওয়ের ম্যানচেস্টার সিটি তারকা আর্লিং হালান্ড। আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের ভাসিয়ে দেওয়া দারুণ ক্রসে বক্সের ভেতর উঁচুতে লাফিয়ে দুর্দান্ত এক হেডে আলিসনকে পরাস্ত করেন তিনি। পুরো ম্যাচে খুব বেশি বল না পেলেও এক সুযোগেই নিজের জাত চিনিয়ে দেন নরওয়ের এই গোলমেশিন।

গোল হজমের পর সমতায় ফেরার চেষ্টা করে ব্রাজিল। ৮৩ মিনিটে ভিনিসিয়ুসের কর্নার থেকেও কোনো লাভ হয়নি। ৮৬ মিনিটে ভাগ্য প্রায় ব্রাজিলের পক্ষে যেতে বসেছিল। প্রতিপক্ষের একজনের গায়ে লেগে বলের গতিপথ বদলে গোলমুখে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্দান্ত উপস্থিত বুদ্ধি ও ক্ষিপ্রতায় নিল্যান্ড ফিরে এসে বল পোস্টে ঠেলে দেন। সেই অসাধারণ সেভে নরওয়ের লিড অক্ষুণ্ন থাকে।

ব্রাজিল যখন মরিয়া হয়ে সমতা ফেরানোর চেষ্টা করছে, তখনই যোগ হয় আরও এক দুঃস্বপ্ন। ৮৯ মিনিটে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে আবারও সুযোগ পান হালান্ড। এবারও কোনো ভুল করেননি তিনি। ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক বুলেট গতির শট নেন হালান্ড। যা আটকাতে পারেননি ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক আলিসন বেকার। এর মাধ্যমে নিজের দ্বিতীয় গোল করে নরওয়েকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন এবং কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন।

তবে যোগ করা সময়ে শেষবারের মতো ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায় ব্রাজিল। কাসেমিরোকে বক্সের ভেতরে কনুই দিয়ে আঘাত করার অভিযোগে ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টি দেন রেফারি। সেই সুযোগ থেকে ১০০তম মিনিটে গোল করেন নেইমার। ধীরগতির রানআপ নিয়ে স্পটকিক থেকে নরওয়ের গোলরক্ষক অরিয়ান নিল্যান্ডকে পরাস্ত করেন তিনি। যদিও পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিতর্কেরও জন্ম হয়। তবুও, নেইমারের গোলে ব্যবধান ২-১ হলেও শেষ মুহূর্তে আর সমতায় ফিরতে পারেনি ব্রাজিল। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ২-১ গোলে জয় নিশ্চিত করে উল্লাসে মেতে উঠে নর্ডিক দলটি।

এদিকে, নরওয়ের এই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম নায়ক গোলরক্ষক অরিয়ান নিল্যান্ডও। ব্রাজিলের ১ম পেনাল্টি ঠেকানোর পাশাপাশি ম্যাচজুড়ে একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে দেন তিনি। সব মিলিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দুর্দান্ত গোলরক্ষণ এবং হালান্ডের নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ব্রাজিলকে হারিয়ে যোগ্যতর দল হিসেবেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে নরওয়ে। অন্যদিকে, শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে শেষ ষোলোর বাধাতেই বিদায় নিতে হলো।

এই হারের ফলে ১৯৯০ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ ব্রাজিল এর আগে ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ঘুরে দাঁড়িয়ে শিরোপা জিতেছিল। এরপর ২০০২ সালে নিজেদের পঞ্চম ও সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয় করে দলটি। তবে সেই সাফল্যের পর আর বিশ্বকাপের শিরোপার দেখা পায়নি সেলেসাওরা।

ব্রাজিলের একাদশ: আলিসন; দানিলো, মার্কিনিওস, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস, দগলাস সান্তোস; ব্রুনো গিমারাইস, কাসেমিরো, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি; রায়ান, মাতেউস কুনিয়া, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।

নরওয়ের একাদশ: ওরইয়ান নিল্যান্ড; ফ্রেডরিক বিয়ারকোন, ক্রিস্টোফার আয়ের, টোরবিয়র্ন হেগেম, ডেভিড মোলার উলফ; সান্ডার বার্গ, প্যাট্রিক বার্গ, মার্টিন ওডেগার্ড, আলেক্সান্দার সরলথ, আন্তোনিও নুসা এবং আর্লিং হলান্ড।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত