নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত অশ্রুসিক্ত নেইমারের
ফুটবলের মুকুটহীন সম্রাটের অবসর ঘোষণা
নেইমার বলেন, ‘চেষ্টা করেছি, নিজের সর্বোচ্চটাই দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু সব শেষ। এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই আমার পথচলা শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ করলাম।’
নরওয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের আকস্মিক ও হতাশাজনক বিদায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই ফুটবলবিশ্বে বড় ধাক্কা। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে দিলেন সেলেসাওদের মহাতারকা নেইমার জুনিয়র। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচ শেষের পরপরই জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার এই ঐতিহাসিক ও আবেগঘন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তিনি।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন নেইমার। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকার পর আর ধরে রাখতে পারলেন না নিজেকে। চোখের জল লুকানোর কোনও চেষ্টাই করেননি তিনি। সতীর্থরা ঘিরে ধরেছিলেন, কেউ কাঁধে হাত রেখেছেন, কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাতে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের বেদনা কমেনি এই ফরোয়ার্ডের। ততক্ষণে ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মাঠে। এমন কঠিন মুহুর্তেও কোন রাখঢাক না করেই ভবিষ্যৎ নিয়ে দিলেন অবসরের মতো বড় সিদ্ধান্ত।
নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২–১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে দলের একমাত্র গোলটি করেছিলেন নেইমার। কিন্তু সেটি পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।

শেষ বাঁশি বাজতেই নরওয়ের খেলোয়াড়রা যখন ঐতিহাসিক জয় উদ্যাপনে মেতে ওঠেন, তখন তার ঠিক উল্টো দৃশ্য ব্রাজিল শিবিরে। কেউ হতাশায় মাঠে শুয়ে পড়েছেন, কেউ দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যটি ছিল নেইমারকে ঘিরে। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি মাঠ ছাড়েন। সতীর্থ কাসেমিরো, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও আলিসন বেকার তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বড় আশা ছিলেন নেইমার। অবশ্য চোটের কারণে গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচ খেলতে পারেননি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন। শেষ বত্রিশে জাপানের বিপক্ষে খেলাই হয়নি তার। আজ ম্যাচের ৬৭ মিনিটে তাকে মাঠে নামান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ম্যাচের শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে গোল করলেওসময় শেষ হয়ে যায় খুব দ্রুত। শেষ পর্যন্ত হতাশাই সঙ্গী হয় ব্রাজিলের।

ম্যাচ শেষে সম্প্রচারকারী জিই টিভিকে দেওয়া সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় আবেগাপ্লুত ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার বলেন, ‘চেষ্টা করেছি, নিজের সর্বোচ্চটাই দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু সব শেষ। এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই আমার পথচলা শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ করলাম।’
আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এটি তার শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। তাই শেষ বাঁশির পর নেইমারের কান্না শুধু একটি ম্যাচে হারের হতাশা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়ের আজীবনের স্বপ্ন অধরা থেকে যাওয়ার বেদনাও হয়ে উঠলো।
এদিকে, নরওয়ের ইতিহাস গড়ার রাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হালান্ড। তার জোড়া গোলেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে নরওয়ে। আর ব্রাজিলের জন্য এই রাত হয়ে থাকল স্বপ্নভঙ্গের, যেখানে শেষ বাঁশির পর নেইমারের অশ্রুই হয়ে উঠল পরাজয়ের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
২০১০ বিশ্বকাপের পর যুক্তরাষ্ট্রেই তৎকালীন কোচ মানো মেনেজেসের অধীনে ব্রাজিল জাতীয় দলে প্রথম ডাক পেয়েছিলেন নেইমার। সেই স্মৃতির কথা মনে করিয়েই বিদায়ের মুহূর্তে কথাগুলো বলেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে নেইমারের দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
এই বিশ্বকাপ ছিল নেইমারের ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬—চারটি আসর খেলেও শিরোপার স্বাদ পাওয়া হলো না তার। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে শিরোপা জিততে না পারা মাত্র দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবে চারটি বিশ্বকাপ খেলার তালিকায় নাম লেখালেন তিনি।
Shamiur Rahman
