বিদায় হে মহারাজা

‘‘অপূর্ণ মহাকাব্যের নায়ক: ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’’

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ০৭ জুলাই ২০২৬ ০৫:৩৮ পিএম

এই বিশ্বকাপে গোলের উল্লাস যেমন আছে, তেমনি আছে অশ্রুরও এক গভীর ইতিহাস। সেই অশ্রুর সবচেয়ে ভারী ফোঁটাটি হয়তো ঝরেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চোখ থেকে। রোনালদোর সেই কান্না শুধু তাঁর নিজের ছিল না; সেই অশ্রু ভিজিয়েছে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ও। কারণ কিংবদন্তিদের চোখের জল কখনও একটি দেশের, একটি দলের কিংবা একটি জার্সির হয় না—তা হয়ে ওঠে পুরো ফুটবল বিশ্বের আবেগের বহিঃপ্রকাশ

আটলান্টিকের পাড়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এই রাতগুলো এখন বড় বেশি নিষ্ঠুর। প্রতিটি সূর্যাস্ত যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসে আরেকটি স্বপ্নভঙ্গের সংবাদ। প্রতিটি রাত নেমে আসে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস হয়ে। এই বিশ্বকাপে গোলের উল্লাস যেমন আছে, তেমনি আছে অশ্রুরও এক গভীর ইতিহাস।

সেই অশ্রুর সবচেয়ে ভারী ফোঁটাটি হয়তো ঝরেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চোখ থেকে। রোনালদোর সেই কান্না শুধু তাঁর নিজের ছিল না; সেই অশ্রু ভিজিয়েছে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ও। কারণ কিংবদন্তিদের চোখের জল কখনও একটি দেশের, একটি দলের কিংবা একটি জার্সির হয় না—তা হয়ে ওঠে পুরো ফুটবল বিশ্বের আবেগের বহিঃপ্রকাশ।

ফুটবল নিছক একটা খেলা নয়; বরং সেটা সভ্যতার আবেগ, মানুষের স্বপ্ন, পরাজয়ের অন্ধকার ভেদ করে উঠে দাঁড়ানোর এক অনিবার্য মহাকাব্য। যুগে যুগে বহু প্রতিভাবান ফুটবলারের আবির্ভাব ঘটেছে, বহু কিংবদন্তি ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন। কিন্তু এর মধ্যেও কয়েকজন ফুটবলার এমন আছেন, যারা শুধুই কিংবদন্তি নন— তারা হয়ে উঠেছেন এক একটি যুগের প্রতীক, কোটি মানুষের আশা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ঠিক তেমনই এক নাম, যার জীবন কাহিনি শুধুমাত্র ফুটবলের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং তা এক অনমনীয় আত্মশক্তি, অক্লান্ত সাধনা ও অবিনাশী মানসিকতার জীবন্ত দলিল।

একজন মানুষ, যিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলকে নিজের ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম আর অদম্য মানসিকতার প্রতিচ্ছবি বানিয়েছেন; যিনি অসম্ভবকে বারবার সম্ভব করে পৃথিবীকে বিস্মিত করেছেন; যিনি প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে পরিণত করেছেন নিজের শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে—শেষ পর্যন্ত তাকেও মাথা নত করতে হলো বিশ্বকাপের সবচেয়ে নির্মম সত্যের সামনে।

পৃথিবীতে আগমনই ছিলো যার অনিশ্চিত; সেই ছোট শিশুই হয়ে উঠলো লাখো কোটি শিশুর আইডল

৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫। পর্তুগালের ছোট্ট দ্বীপ মাদেইরার রাজধানী ফুঞ্চালের সাও পেদ্রোর এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিল এক ফর্সা, রোগাসোগা ছেলে। বাবা জোসে ডিনিস অ্যাভেইরো ছিলেন মালী। মা মারিয়া ডলোরেস অ্যাভেইরো রান্নার এবং ঘরবাড়ি পরিষ্কারের কাজ করতেন। দারিদ্র্য মানুষকে শুধু ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করায় না, কখনও কখনও নিজের স্বপ্ন, নিজের মাতৃত্ব, এমনকি নিজের সন্তানের বিরুদ্ধেও দাঁড় করিয়ে দেয়। মারিয়া ডলোরেস তখন ক্লান্ত এক মা। সংসারে অভাব, ঘরে অনিশ্চয়তা, চোখের সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ। এমন পরিস্থিতিতে চার নম্বর সন্তানকে পৃথিবীতে আনার সাহস তার ছিল না। তাই রোনালদোকে গর্ভে ধারণ করার পর তিনি চেয়েছিলেন গর্ভপাত করতে। নিজের চেনা ডাক্তারের কাছে গিয়েও তিনি কাতর আর্তনাদ করতে থাকেন যে, এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি আর এক সন্তানকে এই পৃথিবীতে আনতে চান না।

কিন্তু ভাগ্য যেন সেদিন অন্য গল্প লিখতে বসেছিল। সেই ডাক্তার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন— ‘এই শিশুকে বাঁচতে দিন।’ সেদিন কেউ জানত না, ডাক্তারের এই পরামর্শ শুধু অ্যাভেইরো পরিবারের ইতিহাস নয় বরং ফুটবল খেলাটাকেও চিরতরে পাল্টে দেবে। মারিয়া ডলোরেস তো শুধু একটি শিশুকে নয়, জন্ম দিয়েছিলেন ফুটবলের অন্যতম সোনালি এক যুগকে। জন্ম দিয়েছিলেন এক গোটা প্রজন্মের অনুপ্রেরণাকে। যে শিশুকে দারিদ্র্য পৃথিবীর আলো দেখতে দিতে চাইছিল না, সেই শিশুই আজ অগুণতি মানুষের জীবনে আলো হয়ে উঠেছে।

রোনালদো অভাবের ঘরে জন্মেছিলেন ঠিকই। তার ছেলেবেলা হয়তো কেটেছে ছোট্ট একটা ঘরে। বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের ড্রিবল করে গোল করা নয়; সেই সময় তার সংগ্রাম ছিল দিনে একদানা ভাত খেতে পাওয়া। কিন্তু রোনালদোর স্বপ্নের উচ্চতা যে ছিল আকাশের থেকেও বড়। তাই তো তিনি প্রমাণ করেছেন—মানুষ কোথা থেকে এসেছে, সেটি বিশ্ব মনে রাখে না; মানুষ কোথায় পৌঁছেছে, সেটাই বিশ্ব মনে রাখে।

ভাবুন তো, যদি সেদিন সেই ডাক্তার ‘হ্যাঁ’ বলে দিতেন, তাহলে হয়তো ফুটবল কখনও তার সবচেয়ে বড় যোদ্ধাকে পেতই না। হয়তো লাখ লাখ দরিদ্র ছেলে বিশ্বাস করতেই শিখত না যে, একজোড়া ছেঁড়া জুতা পরেও পৃথিবীর শীর্ষে পৌঁছানো যায়। এই কারণেই বোধ হয় রোনালদোকে শুধু একজন ফুটবলার বললে ভুল বলা হবে। কারণ তিনি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সেই উত্তর, যা জীবনে প্রতিটি অসহায় মানুষকে শেখায়— ‘তোমার বর্তমান তোমার ভাগ্য নয়।’

ক্যারিয়ারের শুরু

স্থানীয় ক্লাব অ্যান্ডোরিনহার কিটম্যান ছিলেন জোসে অ্যাভেইরো। ছোট্ট রোনালদোকে সঙ্গে নিয়েই মাঠে যেতেন তিনি। এমনভাবেই রোনালদোর জীবনে প্রবেশ করে ফুটবল নামক দ্য বিউটিফুল গেম। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ অ্যান্ডোরিনহায় খেলেছিল মাদেইরার সেই কিশোর। পরে ন্যাশিওনালেও বেশ কিছুদিন খেলেছিল রোনালদো। তবে এমন সময়ে ফুটবল-পাগল ছেলেটার কাছে প্রস্তাব এলো পর্তুগালের অন্যতম বিখ্যাত ক্লাব স্পোর্টিং লিসবনে ট্রায়াল দেওয়ার। তিনদিনের ট্রায়ালের পর স্পোর্টিং লিসবনে প্রথম পেশাদার ফুটবলের চুক্তিতে সই করে রোনালদো। ব্যস আর তাতেই শুরু হলো রূপকথার এক সফর।

সেই কিশোরটির শৈশব ছিল অভাব, সংগ্রাম ও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো— মহত্ত্ব কখনও বিলাসিতার গর্ভে জন্ম নেয় না; তা জন্ম নেয় প্রতিকূলতার গভীর অন্ধকারে। ছোটবেলায় যে ছেলেটি ছেঁড়া বল নিয়ে রাস্তায় খেলত, স্পোর্টিং লিসবন থেকে শুরু করে আল নাসের– ৪০ বছর বয়সেও সেই ছেলেই বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করবে— এমন কল্পনা হয়তো তখন অসম্ভব বলেই মনে হতো। অথচ আজ ফুটবলের অভিধানে ‘অধ্যবসায়’ শব্দটির প্রতিশব্দ যেন হয়ে উঠেছেন রোনালদো।

ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড হোক কী রিয়াল মাদ্রিদ। জুভেন্তাস হোক কী আল নাসের। প্রতিটা ক্লাব জার্সিতেই নিজের সেরাটা দিয়েছেন রোনালদো। গোলের পর গোল। ট্রফির পর ট্রফি। রেকর্ডের পর রেকর্ড। পাঁচ পাঁচটা ব্যালন ডি’অর। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ইউরোপের শীর্ষে তুলেছেন, রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে চারবার জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে বার্নাব্যুকে বানিয়েছেন নিজের রাজত্ব। তারপর পর্তুগালের জার্সিতে এনে দিয়েছেন ইউরো ও নেশনস লিগ, যে স্বপ্ন একসময় অসম্ভব মনে হতো।

রোনালদোর ফুটবল ক্যারিয়ার প্রায় প্রতিটা এভারেস্ট জয় করেছে। হার না মানা মানসিকতা। লড়াই করার অদম্য জেদ। অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখানো। রোনালদোর ফুটবল ক্যারিয়ার মানে ঠিক তাই। জাদুর সব মুহূর্ত উপহার দিয়েই রোগাসোগা সেই মাদেইরার ছেলেটা হয়ে উঠেছেন সিআর সেভেন। সাত নম্বর জার্সি পরে আজও তিনি মাঠে নামলে গ্যালারি স্বপ্ন দেখে তারা ইতিহাসের সাক্ষী থাকবে।

দেশের হয়ে অর্জন

পর্তুগালের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলেও সিআর সেভেনের পরিসংখ্যান শুধুমাত্র বিস্ময়কর নয়, প্রায় অলৌকিক। জাতীয় দলের হয়ে ২২৬ ম্যাচে ১৪৩ গোল— আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বাধিক গোলদাতার আসনে তার একক আধিপত্য। পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করার কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রথম ফুটবলারও তিনি। ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বাধিক গোল, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সর্বাধিক জয়— পরিসংখ্যানের প্রতিটি স্তম্ভে যেন তার নাম খোদাই করা। ২০১৬ সালে তার নেতৃত্বে পর্তুগালের ইউরো জয় ছিল এক ঐতিহাসিক অধ্যায়, যেখানে ছোট্ট একটি দেশ তার অদম্য মানসিকতার অনুপ্রেরণায় সমগ্র ইউরোপকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ২০১৯ সালে উয়েফা নেশনস লিগ জয় সেই গৌরবকে আরও সুদৃঢ় করে।

বিশ্বকাপের লড়াই

এত সাফল্য, এত স্বর্ণালি অধ্যায়ের মাঝেও এক অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস তাকে আজও অনুসরণ করে। সেই অপূর্ণতার নাম— ফিফা বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপ এমন এক মঞ্চ, যেখানে কিংবদন্তিদের যাত্রাও কখনও কখনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পেলের গোল, দিয়েগো ম্যারাডোনার চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিং, লিওনেল মেসির মানব থেকে অতিমানবে পরিণত হওয়া— বিশ্বকাপ যেন মহত্ত্বের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। আর সেই কারণেই প্রতিটা সিআর তথা ফুটবল সমর্থক আজও রোনালদোর হাতে সেই ঐতিহাসিক ট্রফিটা দেখার স্বপ্ন লালন করে চলেছেন।

২০০৬ সালের জার্মানিতে হওয়া বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সেই বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রতিভার প্রদর্শনী দেন তরুণ রোনালদো। তখন তার চোখে ছিল তীব্র ক্ষুধা, নিজের সামর্থ্যকে বিশ্বের সামনে প্রতিষ্ঠিত করার অগ্নিসংকল্প। সেই বিশ্বকাপে পর্তুগাল সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছলেও জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। কিন্তু সেই ব্যর্থতার মধ্যেও ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী থেকেছিল এক নতুন তারকার উত্থানের।

২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে রোনাল্ডো তখন আরও পরিণত, আরও ভয়ংকর। কিন্তু ফুটবলে ব্যক্তিগত প্রতিভা হার মেনেছে দলগত খেলার বিরুদ্ধে। সেই বিশ্বকাপেও স্পেনের তিকিতাকার বিরুদ্ধে ম্লান হয়ে শেষ ষোলোয় বিদায় হয় পর্তুগালের।

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে চোট ও দুর্বল স্কোয়াডের বোঝা কাঁধে নিয়েও সিআর সেভেন লড়াই করেছিলেন, কিন্তু ভাগ্য তখনও তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল না। গ্রুপ পর্বেই বিদায় হয় পর্তুগালের। জার্মানির বিরুদ্ধে ০-৪ হার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২-২ ড্র পর্তুগালের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন শেষ করেছিল। ঘানাকে ২-১ হারালেও গোলপার্থক্যে আর শেষ ষোলোয় পৌঁছতে পারেনি রোনাল্ডো অ্যান্ড কোম্পানি।

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিরুদ্ধে পর্তুগালের সেই ৩-৩ ড্র ম্যাচে রোনালদোর অবিস্মরণীয় হ্যাটট্রিক সমগ্র বিশ্বকে নতুন করে বিস্মিত করেছিল। ৩৩ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তিনি যেন সময়কেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। তার ফ্রি-কিকের সেই মুহূর্ত আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। সেদিন মনে হয়েছিল— হয়তো ভাগ্য এবার তার জন্য নতুন কোনো মহাকাব্য লিখতে চলেছে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস আবারও তাকে অপূর্ণ রেখেছিল। শেষ ষোলোয় উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ১-২ হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় পর্তুগাল।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ছিল তার আর এক সুযোগ। তখন রোনালদোর শরীরে বয়সের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু মানসিক দৃঢ়তা ছিল আগের মতোই অবিচল। সমালোচকরা তাকে ফুরিয়ে যাওয়া অধ্যায় বলে ব্যাখ্যা করছিলেন, অথচ তিনি তখনও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে একই তীব্র আবেগে লড়াই করে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু মরক্কোর কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হারের পর টানেল দিয়ে অশ্রুভেজা চোখে রোনালদোর ড্রেসিংরুমে ফিরে যাওয়ার দৃশ্যটি যেন ফুটবলের এক গভীর ট্র্যাজেডি হয়ে রয়ে গেল। কারণ সেই দিন শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড় পরাজিত হননি; ভেঙে পড়েছিল কোটি মানুষের স্বপ্ন, এক গোটা প্রজন্মের আবেগ।

অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপেও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই ঘটলো পর্তুগালের। এবারও বিশ্বকাপ জয় অপূর্ণই রইলো সিআরসেভেনের। তিনি আগেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন; তাই ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে তরুন তুর্কি মিকেল মেরিনোর দেয়া গোলে স্পেনের কাছে ১-০ তে পর্তুগালের পরাজয়ের রাতে আবারও ট্র‍্যাজিক বিদায় ঘটলো কিংবদন্তি ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলশূন্য ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের লড়াইয়ে যাওয়ার ক্ষন গুনছে ঠিক সেই মুহুর্তে ইনজুরি সময়ে মেরিনোর গোল আরও একবার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ট্র‍্যাজিক হিরো বানালো। এমন পরাজয় আসলেই মেনে নেওয়া কষ্টকর আর সেটা যদি আবার পুনরাবৃত্তি হয় তাহলে সেটি হৃদয় ভেঙে খানখান হয়ে যাওয়ারই শামিল। 

সংখ্যা তাঁকে বিচার করতে পারে না। রেকর্ড তাঁকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। পাঁচটি ব্যালন ডি'অর, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, অসংখ্য লিগ শিরোপা, শত শত গোল, দেশের ইতিহাসে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি—সবই তাঁর অর্জনের অংশ। কিন্তু বিশ্বকাপ নামের এক সোনালি স্বপ্ন বারবার হাতছানি দিয়েও অধরাই রয়ে গেল।

হয়তো ইতিহাস লিখবে—তিনি বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। কিন্তু ইতিহাসের বাইরেও আরেকটি সত্য আছে। সেটি হলো, রোনালদো কোটি মানুষের কাছে কখনো কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিশ্বাসের আরেক নাম। তিনি শিখিয়েছেন, জন্মগত প্রতিভার চেয়েও বড় শক্তি হলো কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং কখনো হার না মানা।

যে ছেলেটি পর্তুগালের ছোট্ট দ্বীপ মাদেইরা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, সে একদিন পুরো পৃথিবীকে নিজের স্বপ্নের অংশ করে নিয়েছিল। কত শিশু তাঁর জার্সি পরে প্রথম ফুটবলে পা ছুঁয়েছে, কত তরুণ তাঁর উদযাপন অনুকরণ করে নিজেদের স্বপ্ন গড়েছে, কত মানুষ জীবনের কঠিন সময়ে তাঁর লড়াই থেকে শক্তি খুঁজে পেয়েছে—এসব কোনো পরিসংখ্যানের পাতায় লেখা থাকে না।

সময় একদিন তাঁর গতি কেড়ে নেবে, শক্তি কমিয়ে দেবে, হয়তো মাঠ থেকেও বিদায় নিতে বাধ্য করবে। কিন্তু কিংবদন্তিদের বিদায় হয় না। তাঁরা বেঁচে থাকেন মানুষের স্মৃতিতে, আবেগে, অনুপ্রেরণায়।

সব নায়কের গল্প সুখের সমাপ্তি পায় না। কিছু গল্প অপূর্ণ থেকে যায় বলেই যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। রোনালদোর বিশ্বকাপ-অধ্যায়ও তেমনই—একটি অসমাপ্ত কবিতা, একটি অপূর্ণ স্বপ্ন, একটি অনন্ত আবেগ।

বিশ্বকাপ হয়তো তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে জায়গা পায়নি, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি আজীবন চ্যাম্পিয়ন। এই কারণেই ফুটবলের ইতিহাসে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো শুধু একজন কিংবদন্তি নন—তিনি এক অপূর্ণ মহাকাব্যের নায়ক।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত