আটলান্টায় ১৩ মিনিটের ব্যবধানে ৩ গোল করে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন
৫ মিনিটের মেসিঝড়ে লণ্ডভণ্ড মিশর
৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ তে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা ১৩ মিনিটের দুর্দান্ত দলগত পারফরম্যান্সে অবিশ্বাস্য এবং অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তন করে। আর এর মূল অনুঘটক অতিমানব লিওনেল মেসির ৫ মিনিটের ঝড় তোলা পারফরম্যান্স
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র মঞ্চে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে এক চরম নাটকীয়তার সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। একদিকে মাঠের বাইরে ফিলিস্তিনের মানবিক সংকট নিয়ে বিশ্বমঞ্চে সুর চড়ানো কিংবদন্তি হোসাম হাসানের লড়াকু মিশর, অন্যদিকে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নামা লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের বয়স তখন ৭৯ মিনিট। স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে মিশর ২ - আর্জেন্টিনা ০। গ্যালারি থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে তখন ভক্ত-সমর্থকরা চরম বিষাদে ডুবে আছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ট্রল। নেইমারের ব্রাজিল, রোনালদোর পর্তুগাল কিংবা জার্মানির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনাও কি তবে একই ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে- এমন এক আশঙ্কায় গ্যালারির আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের চোখমুখে তখন কেবলই বিষাদের মেঘ।
ঠিক তখনই ফিনিক্স পাখির মত জেগে উঠলেন এই মুহুর্তে ফুটবল দুনিয়ার একমাত্র মহাতারকা লিওনেল মেসি। মাত্র ৫ মিনিটের এক অবিশ্বাস্য এবং অপ্রত্যাশিত ঝড় তুললেন আটলান্টায়। এই স্বল্পতম সময়ে মেসির নিঘুত ক্রসে হেড করে রোমেরার গোল এবং ৪ মিনিট পর ল্যাতিন ফুটবলের মহানায়কের এক অতিমানবীয় গোল শুধু মাঠের দৃশ্যপটই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছিলো খাদের কিনারায় সলিলসমাধির ক্ষনগননায় ব্যস্ত আর্জেন্টিনা দলকে।
এর পরের ৮ মিনিট আর্জেন্টাইন রূপকথার এক মহাকাব্য রচিত হলো আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে। এই সময়টাতে মাঝমাঠের নিখুঁত পাসিং, উইং দিয়ে ক্ষিপ্রগতির মুহুর্মুহু আক্রমণ এবং ডি-বক্সের ভেতর ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের খুনে মেজাজের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে মিশরের এতক্ষণের জমাট ডিফেন্স।
যখনই মনে হচ্ছিল ম্যাচটি আর্জেন্টিনার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে বা অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছে, ঠিক তখনই দৃশ্যপট বদলে যায়। ফুটবল ইতিহাসে বড় দলগুলোর শক্তির আসল পরিচয় পাওয়া যায় খাদের কিনারে দাঁড়ায়। সেই খাদের কিনারে আর্জেন্টিনা শিবিরে যে দুঃস্বপ্নের মেঘ দানা বেঁধেছিল, তা মাত্র ১৩ মিনিটের এক টর্নেডো ঝড়ে উড়িয়ে দেয় লিওনেল স্কালোনির দল।
এই ১৩ মিনিটের ভেতর মাঝমাঠের নিখুঁত পাসিং, উইং দিয়ে ক্ষিপ্র আক্রমণ এবং ডি-বক্সের ভেতর ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের খুনে মেজাজের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে মিশরের এতক্ষণের জমাট ডিফেন্স। ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেডারে গোলের খাতা খুলে শুরু, চার মিনিট পরই দলকে সমতায় ফেরান আর্জেন্টাইন জাদুকর। এরপর যোগ করা সময়ে দলের জয়সূচক গোল এঞ্জোর। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের ব্যবধানেই ম্যাচের ভাগ্য নিজেদের করে নেয় আর্জেন্টিনা, যা ফারাওদের পুরো ম্যাচ জুড়ে করা সমস্ত পরিকল্পনা ও প্রতিরোধকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
মাঠের লড়াইয়ে ম্যাচের অধিকাংশ সময় জুড়ে আলবিসেলেস্তে শিবিরে ভর করেছিল অকাল বিদায়ের এক চরম দুঃস্বপ্ন, কিন্তু সেই দুঃস্বপ্নকে জয় করে চেনা ছন্দে জেগে উঠতে আর্জেন্টিনার লেগেছে মাত্র ১৩টি মিনিট!
এর আগে, র্যাঙ্কিংয়ে ২৪ নম্বরে থাকা মিসর এবারের বিশ্বকাপে চমক দেখিয়েছে বেশ। মোহামেদ সালাহ, মোস্তাফা জিকোদের নিয়ে গড়া এই দলটি যোগ্যতর প্রতিপক্ষ হিসেবেই জায়গা করে নিয়েছে শেষ ষোলোয়। আর নীল নদের এই দেশটিই কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিতের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ হয় আর্জেন্টিনার। মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজদের মত তারকায় ঠাঁসা আলবিসেলেস্তেদের জন্য মিসরের বিপক্ষে ম্যাচটা যে কঠিন হতে যাচ্ছে সেই আন্দাজ করেছিলেন অনেকেই। তবে কে ভেবেছিলেন, এতোটাই ভোগাবেন সালাহরা।
এদিন, শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছিল মিশর। ১৫তম মিনিটে শর্ট কর্নার থেকে আতিয়ার ক্রসে শক্তিশালী হেডে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন ইয়াসের ইব্রাহিম। ২০তম মিনিটে সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। এনসো ফার্নান্দেসের পাস ধরে বক্সে ঢুকে ফাউলের শিকার হন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। তবে লিওনেল মেসির স্পট কিক দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের।
এরপরও আক্রমণ চালিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ২৮তম মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শক্তিশালী হেড এবং ৩৯তম মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজের নিচু শটও অসাধারণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন শোবের। প্রথমার্ধ শেষে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় মিশর।
বিরতির পর ব্যবধান আরও বাড়ায় আফ্রিকার দলটি। ৫৭তম মিনিটে মোস্তফা জিকোর একটি গোল ভিএআরের সহায়তায় ফাউলের কারণে বাতিল হয়। তবে হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৬৭তম মিনিটে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে গোল করেন জিকো। আক্রমণের সূচনা করেন মোহাম্মদ সালাহ। ডান প্রান্তে বল পেয়ে হাইসেম হাসান নিচু ক্রসে বল বাড়িয়ে দেন জিকোর কাছে। কোনো মার্কিং ছাড়াই সহজ শটে বল জালে জড়ান তিনি। তাতে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মিশর। এরপর যা হলো তা এককথায় ইতিহাস।
ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলে বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের মন জয় করেছিলেন মিশর কোচ হোসাম হাসান। ফুটবলকে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে মানবতার যে ডাক তিনি দিয়েছিলেন, তা মাঠের খেলায় তাঁর দলও ফুটিয়ে5 তুলেছিল এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু দিনশেষে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ তারকাদের ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্ব এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের কাছে থামতে হয়েছে তাদের।
এই জয়ের মাধ্যমে টুর্নামেন্টের হট-ফেভারিট হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা। ফুটবল যেমন নিষ্ঠুর, ঠিক তেমনই রোমাঞ্চকর- একদিকে নেইমারের চোখের জলে বিদায়ের ট্র্যাজেডি, অন্যদিকে মাত্র ১৩ মিনিটের ঝড়ে দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
Shamiur Rahman
