‘‘মেসি ইকোনমিকস: ফুটবল পুঁজিবাদের নতুন অধ্যায়"

মোস্তফা কামাল আকন্দ প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০২৬ ০৬:২৫ পিএম

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাধুলার নিয়ন্তা সংস্থাটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেয়ে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সুবিধাকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে

ফুটবল আজ আর কেবল মাঠের খেলা নয়, বরং এখন এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।' লিওনেল মেসি এখন কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি নিজেই একটি বিলিয়ন-ডলারের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালের চুক্তিতে তাঁর আয় দাঁড়িয়েছে ৮৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মেজর লিগ সকার (এমএলএস)-এর ক্লাব ইন্টার মায়ামি সিএফ-এ যোগ দেওয়ার পর থেকে মায়ামির অর্থনীতি, আবাসন ও পর্যটন খাতে বিপুল প্রবৃদ্ধি ঘটেছে।

এদিকে, ৭ জুলাই রাতে আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচে আর্জেন্টিনার ভূমিকা ক্ষীণ হলেও, লিওনেল মেসি নামটি হয়ে উঠে ফুটবল পুঁজিবাদের কেন্দ্রীয় চরিত্র।

বর্তমানে পুঁজি, ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের এক জটিল ত্রিভুজ, যেখানে ফুটবল আর কেবল খেলা নয়, রীতিমতন বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনীতির রণক্ষেত্র। এই রণক্ষেত্রের নিয়ম বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, করপোরেট স্বার্থ এবং ক্রীড়া ও কর্তৃত্ববাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের দিকে।

কার্ল মার্ক্সের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে আন্তোনিও গ্রামসির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের তত্ত্ব এবং আধুনিক বৈশ্বিক শাসনতত্ত্ব পর্যন্ত—সকলেই একটি প্রশ্নকে কেন্দ্রে রেখেছেন। সেটি হলো, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার স্বার্থ রক্ষা করে? ফিফা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে একটি অস্বস্তিকর সত্য বের হয়ে আসবে—বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাধুলার নিয়ন্তা সংস্থাটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেয়ে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সুবিধাকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ক্লাব ও শহরের অর্থনৈতিক রূপান্তর

লিওনেল মেসির ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেয়ার খবর প্রকাশ পায় ৭ই জুন। তখন থেকে দুই মাসের মধ্যে গুগল সার্চের হিসেবে ইন্টার মায়ামির জনপ্রিয়তা বেড়েছে শতকরা ১,২০০ ভাগেরও বেশি। ইন্টার মায়ামি দলটি কী খেলে, এটাই যারা জানতো না, তাদের অনেকেই এই দুই মাসের মধ্যে হয়ে গেছে দলটির সবচেয়ে বড় ফ্যান।

ইন্টার মায়ামি ক্লাবের দাম মেসির আগমনে ৫৮৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৩৫–১.৪৫ বিলিয়ন ডলার। মাত্র দুই বছরের মধ্যে ক্লাবের বার্ষিক আয় ৫৬ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০০ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। 

ইন্টার মায়ামি ক্লাবের সাথে মেসির চুক্তিটি ২০২৮ সাল পর্যন্ত বর্ধিত হয়েছে। বার্ষিক ২৫ মিলিয়ন ডলার বেতনের পাশাপাশি তিনি অ্যাপল ও অন্যান্য লিগ স্পনসরদের সম্প্রচার থেকেও লভ্যাংশ পান।

ইন্টার মায়ামি মেসির জার্সি বিক্রি শুরু করার প্রথম ২৪ ঘন্টায় যে পরিমাণ জার্সি বিক্রি হয়, তা পৃথিবীর সব ধরণের খেলার যে কোনো খেলোয়াড়ের জার্সি বিক্রির রেকর্ড ভেঙে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রে মেসির উপস্থিতি শুধু ক্লাব নয়, পুরো মায়ামি শহরকে অর্থনৈতিকভাবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তার আগমনের পর দ্রুত নির্মিত হয়েছে এনইউ স্টেডিয়াম ও মায়ামি ফ্রীডম পার্ক, যা এক বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হিসেবে স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করেছে।

পর্যটন ও রিয়েল এস্টেট

মেসির শহরে বাড়ি কেনা এখন ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, মেসির কারণে মায়ামি রিয়েল এস্টেট ও পর্যটনের নতুন হটস্পটে পরিণত হয়েছে। তার খেলা থাকলে হোটেল, বার, রেস্টুরেন্টে কেয়ামত শুরু হয়। আমেরিকানরা যাদের কাছে ফুটবল ছিল “ইউরোপিয়ান খেলা”, তারাই এখন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে বড় পর্দায় খেলা দেখতে ছুটছে।

ফিফা ও বৈশ্বিক আয়

ফিফার হিসেব অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপ থেকে আয় হবে ৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাই আয় করবে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে স্থানীয়ভাবে জার্সি বিক্রি, জুয়া, হোটেল ও অন্যান্য খাত থেকে কোটি কোটি ডলার আয় হবে। আর এই আয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র আর্জেন্টাইন ফুটবলের মহানায়ক লিওনেল মেসি—তার উপস্থিতি ছাড়া এই অর্থনৈতিক উল্লম্ফন সম্ভব হতো না।

সাধারণ ভালোবাসা বনাম পুঁজিবাদ: ফুটবলপ্রেমীদের সাধারণ ভালোবাসাকে ঠকিয়ে পুঁজিবাদ কায়েম করার এই মনোবৃত্তি কিভাবে উতরানো যাবে?

খেলার সৌন্দর্যকে অগ্রাধিকার: দর্শকরা যদি খেলার শিল্প ও আবেগকে গুরুত্ব দেন, তবে ব্যবসায়িক চাপ কিছুটা কমবে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ: ফিফা ও ক্লাবগুলোকে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে, যাতে বোঝা যায় দর্শকের খরচ আসলে খেলাধুলার উন্নয়নে যাচ্ছে।

ফ্যানদের সচেতনতা: অন্ধ সমর্থনের বদলে সচেতন সমর্থন ফুটবলকে ব্যবসার একচেটিয়া দখল থেকে রক্ষা করতে পারে।

স্থানীয় ফুটবলের শক্তি: স্থানীয় ফুটবলকে শক্তিশালী করা গেলে দর্শকরা বিকল্প খুঁজে পাবে, ফলে বৈশ্বিক কর্পোরেট চাপ কিছুটা কমবে।

মেসি না থাকলে সম্ভাব্য ক্ষতি

বিশ্বকাপ আয়োজকরা হিসেব করেছেন, মেসি ছাড়া টুর্নামেন্ট হলে আয় কমে যেতে পারে ১০–১৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।

টিকিট বিক্রি: মেসির ম্যাচে গড় দর্শকসংখ্যা অন্য ম্যাচের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তার অনুপস্থিতিতে টিকিট বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে যাবে।

টিভি ও স্ট্রিমিং: অ্যাপল টিভি ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে মেসি-প্রভাবিত সাবস্ক্রিপশন কয়েক মিলিয়ন। তার অনুপস্থিতিতে এই আয় হ্রাস পাবে।

স্পনসরশিপ: অ্যাডিডাস, অ্যাপল টিভি, স্থানীয় হোটেল ও রেস্টুরেন্ট—সবখানেই চলছে মেসি-নির্ভর ব্যবসা। এই মহাতারকার দল আর্জেন্টিনা যদি বিশ্বকাপ থেকে আগেই ছিটকে যায় তাহলে মেসির অনুপস্থিতিতে ধ্বস নামবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে, কমে যাবে স্পনসরশিপের মূল্য।

ক্লাব ও শহরের অর্থনীতি: ইন্টার মায়ামি এবং মায়ামি শহর মেসি ছাড়া কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

মূল্যায়ন 

মেসি আজ ফুটবল অর্থনীতির প্রতীক। তার উপস্থিতি বিশ্ব ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তবে একইসাথে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগকে ব্যবসায়িক মুনাফার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। যদি মেসি না থাকেন, বিশ্বকাপ আয়োজকরা কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়বে—যা প্রমাণ করে, ফুটবল এখন কেবল খেলার আবেগ নয় বরং বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কেন্দ্রীয় মঞ্চ।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত