লাল ফিতার দৌরাত্ম্য
গনপূর্তে ৩১১ কর্মকর্তার ‘কাগুজে’ পদায়নের নেপথ্যে
গণপূর্ত অধিদপ্তরে ৩১১ জন কর্মকর্তার ‘কাগুজে’ বা অস্তিত্বহীন অফিসে পদায়নের নেপথ্যে মূলত রয়েছে রাজনৈতিক তদবির, পদোন্নতি বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা
প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন বাস্তবে কী ঘটতে পারে—তার এক অভিনব উদাহরণ তৈরি করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন বেগবান করতে যে ৩১১টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা এখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য এক মানসিক ও পেশাদারী ফাঁদে পরিণত হয়েছে। পদ আছে, পদোন্নতি ও বদলিও আছে; কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই অফিসের কোনো অস্তিত্ব নেই।
গণপূর্ত অধিদপ্তরে ৩১১ জন কর্মকর্তার ‘কাগুজে’ বা অস্তিত্বহীন অফিসে পদায়নের নেপথ্যে মূলত রয়েছে রাজনৈতিক তদবির, পদোন্নতি বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা। মূলত কোনো প্রকার সুনির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র বা অবকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি ও বদলি দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এই কর্মকর্তাদের অস্তিত্বহীন দপ্তরে বসিয়ে রাখা হয়েছে।
লজিস্টিকস ও কোড জটিলতা
যেখানে ফাইলবন্দি উন্নয়ন একটি নতুন সরকারি দপ্তর চালুর মৌলিক শর্ত হলো তার আর্থিক ও প্রশাসনিক কোড সচল হওয়া। অথচ গত বছরের আগস্টে জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পদের অনুমোদন মিললেও, এখনো মেলেনি অফিস কোড এবং আইবাস (iBAS) কোড। এই সামান্য একটি কোডের অভাবে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা সংক্ষেপে নিম্নরূপ:
আর্থিক স্থবিরতা
কোনো কোড না থাকায় নতুন পদে যোগদানকারী কর্মকর্তারা বিগত ৫ থেকে ১০ মাস ধরে সম্পূর্ণ বেতন-ভাতা বঞ্চিত।
উন্নয়ন থমকে যাওয়া
নতুন উইংগুলোর অধীনে থাকা এলাকার টেন্ডার (দরপত্র) প্রক্রিয়া, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে পুরনো বিভাগগুলো থেকে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।
লজিস্টিক শূন্যতা
নতুন কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ নেই কোনো স্থায়ী বসার জায়গা, আসবাবপত্র, প্রয়োজনীয় সাপোর্টিং স্টাফ কিংবা সরকারি পরিদর্শনের যানবাহন।
মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র: কর্মকর্তাদের উদ্বাস্তুরূপ
কাগজে-কলমে বিশাল দায়িত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবতার জমিনে কর্মকর্তারা কতটা অসহায়, তা কয়েকটি ঘটনা খতিয়ে দেখলেই স্পষ্ট হয়:
১. শেরেবাংলানগর বিভাগ-৪: ঢাকা ডিভিশন-২ থেকে বদলি হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল্লাহ দীর্ঘ ১০ মাস ধরে নিজের অফিস এবং তার আওতাধীন এলাকাই খুঁজে পাননি।
২. ইএম ডিভিশন-১২: জাতীয় সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেনকে এই বিভাগে বদলি করা হলেও, অফিস না থাকায় তাকে কেবল পূর্ত ভবনে হাজিরা দিয়েই দিন পার করতে হচ্ছে।
৩. সার্কেল-৫ ও মহাখালী ডিভিশন: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোস্তফা কামালকে সার্কেল-৫ এর দায়িত্ব দেওয়া হলেও অফিস না থাকায় তিনি মহাখালী ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবুল ইসলামের কক্ষটি ব্যবহার করছেন। ফলে মূল নির্বাহী প্রকৌশলী নিজেই এখন নিজ দপ্তরে স্থানচ্যুত।
৪. অবসরের দোরগোড়ায় মানবিক সংকট: বিসিএস ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম) হলেও গত ৬ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। আগামী ডিসেম্বরে তার অবসরে যাওয়ার কথা, অথচ কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি পার করছেন চরম মানবেতর দিন।
সমন্বয়হীনতার দায় কার?
গণপূর্ত অধিদপ্তর নতুন পদে পদোন্নতি ও বদলি করার ক্ষেত্রে যতটা তৎপরতা দেখিয়েছে, সেই অফিসগুলোর সীমানা নির্ধারণ কিংবা লজিস্টিকস ]
ন করার বিষয়ে ততটাই উদাসীন ছিল। ভুক্তভোগী প্রকৌশলীদের মতে, প্রশাসনের উচিত ছিল প্রথমে অফিস অবকাঠামো, বাজেট কোড এবং কর্মবণ্টন নিশ্চিত করা; তারপর কর্মকর্তাদের পদায়ন করা।
যদিও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী আশ্বস্ত করেছেন যে আইবাস ও অফিস কোডের সমস্যা দ্রুতই সমাধান হবে, কিন্তু ততদিনে কর্মকর্তাদের পেশাগত মর্যাদা ও পারিবারিক জীবনে যে বড় ধাক্কা লেগেছে, তার দায়ভার এড়ানো কঠিন।
একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে এমন "অস্তিত্বহীন" দপ্তরের ধারণা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই প্রকাশ করে না, বরং সরকারি কর্মীবাহিনীর মনোবলও ভেঙে দেয়।
Shamiur Rahman
