বৃষ্টির দ্বৈত চরিত্র এবং আমাদের দায়িত্ব
রহমত ও বিপদের এই দ্বৈত রূপ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আবেগ নয়, বাস্তবসম্মত প্রস্তুতিই পারে বৃষ্টিকে কেবল আশীর্বাদ হিসেবে ধরে রাখতে
বৃষ্টি প্রকৃতির অনিবার্য চক্র। এটি ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। কৃষি, পানির উৎস, পরিবেশের ভারসাম্য — সবকিছুই নির্ভর করে বৃষ্টির উপর। একইসাথে এই বৃষ্টিই যখন সময় ও মাত্রা হারায়, তখন তা জনজীবনে নেমে আনে চরম ভোগান্তি। রহমত ও বিপদের এই দ্বৈত রূপ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আবেগ নয়, বাস্তবসম্মত প্রস্তুতিই পারে বৃষ্টিকে কেবল আশীর্বাদ হিসেবে ধরে রাখতে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। এখানে বৃষ্টির একটি ফোঁটাও মূল্যবান। বর্ষার পানিতে মাঠ ভরে, ধানের চারা বেড়ে ওঠে। নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুরে পানি আসে। ভূগর্ভের পানির স্তর পুনর্ভরিত হয়। শহরের প্রচণ্ড দাবদাহের পর বৃষ্টি নিয়ে আসে স্বস্তি। ধুলো-ময়লা ধুয়ে যায়, বাতাস পরিষ্কার হয়। মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা — সবার জন্যই বৃষ্টি প্রাণের সঞ্চার করে। এই কারণেই কৃষক বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে, নগরবাসী গরম থেকে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন বৃষ্টি পরিণত হয় অতিবৃষ্টিতে। কয়েকদিনের টানা বর্ষণে নদীর পানি ফুলে ওঠে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। বছরের পর বছর কষ্ট করে ফলানো ফসল এক রাতের পানিতে নষ্ট হয়ে যায়।
শহরের চিত্র আরও ভয়াবহ। আধুনিক নগর পরিকল্পনার অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই প্রধান সড়কগুলো পানিতে ডুবে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর, খাল-নালা ময়লায় ভরা। ফলে পানি নামার জায়গা থাকে না। যানজট, কর্মঘণ্টার ক্ষতি, স্কুল-কলেজ বন্ধ — নগর জীবন স্থবির হয়ে পড়ে। জমে থাকা পানি থেকে ডেঙ্গু, টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়ায়। বিদ্যুতের খুঁটি ও তার থেকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
এই দুর্ভোগের জন্য শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করলে চলবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে তা সত্য। কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ আমাদের নিজেদের অব্যবস্থাপনা। নদী ও খাল দখল করে ভবন তোলা হয়েছে। পানি যাওয়ার প্রাকৃতিক পথ বন্ধ। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে ড্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। বনভূমি উজাড় হওয়ায় মাটি পানি ধরে রাখতে পারছে না। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টিও বিপদ হয়ে দেখা দিচ্ছে।
তাহলে উপায় কী? বৃষ্টি বন্ধ করা সম্ভব নয়। বরং বৃষ্টির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। প্রথম কাজ হলো পরিকল্পনা। নগর ও গ্রামে টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। খাল-নদী উদ্ধার করে পানি প্রবাহের পথ খুলে দিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে খরার সময় তা কাজে লাগে। বাড়ির ছাদে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং জনপ্রিয় করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সচেতনতা। রাস্তায়, ড্রেনে ময়লা ফেলার অভ্যাস বদলাতে হবে। বন্যা ও জলাবদ্ধতার আগাম পূর্বাভাস পেলে প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়।
বৃষ্টি আমাদের শত্রু নয়। এটি আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত। সমস্যা হয় তখন, যখন আমরা প্রকৃতির নিয়মকে অগ্রাহ্য করি। বৃষ্টিকে যদি আমরা শুধু রহমত হিসেবে পেতে চাই, তবে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। নইলে প্রতি বর্ষায় আমরা একই ভোগান্তির চক্রে ঘুরতে থাকব। এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার — বৃষ্টিকে আমরা অভিশাপ বানাব, নাকি প্রকৃত বন্ধু হিসেবে ধরে রাখব।
সালাহউদ্দিন মিঠু
Shamiur Rahman
