এগিয়ে থেকেও চোখের জলে বিদায় ইংল্যান্ডের
৫ মিনিটের মেসি-ম্যাজিকে ফাইনালে আর্জেন্টিনা
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলার শেষদিকে যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনা লিড পায়। ডান পাশ থেকে মেসির দারুণ এক ক্রসে লাফিয়ে ওঠেন লাউতারো। তার আশেপাশেও ইংলিশ কোনো ডিফেন্ডার ছিলেন না, ফাঁকায় দাঁড়িয়ে তার করা হেডার গিয়ে জড়ায় ইংল্যান্ডের জালে
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অবিশ্বাস্য নাটকীয়তার জন্ম দিল আর্জেন্টিনা। একসময় ম্যাচ থেকে বিদায় নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা শেষ পাঁচ মিনিটে দুই গোল করে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে।
আটলান্টার গর্জনমুখর স্টেডিয়ামে দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু শেষ মুহূর্তে লিওনেল মেসির দুটি দুর্দান্ত অ্যাসিস্টে প্রথমে এনজো ফার্নান্দেজ এবং পরে বদলি লাউতারো মার্তিনেজ গোল করে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে দেন।
৬০ বছর পর ফাইনালে খেলার হাতছানি থাকলেও ইংলিশদের ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলার শেষদিকে যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনা লিড পায়। ডান পাশ থেকে মেসির দারুণ এক ক্রসে লাফিয়ে ওঠেন লাউতারো। তার আশেপাশেও ইংলিশ কোনো ডিফেন্ডার ছিলেন না, ফাঁকায় দাঁড়িয়ে তার করা হেডার গিয়ে জড়ায় ইংল্যান্ডের জালে।
এর আগে, শর্ট কর্নার থেকে বল নিয়ে বক্সের কাছে আসছিলেন মেসি। বক্সের বাইরে থাকা এনজো ফার্নান্দেজকে বলটা বাড়ান তিনি। পুরো ইংলিশ রক্ষণ মনে করেছিল মেসিই ফিরতি বলটা পাবেন, কিন্তু তা হলো না। এনজো ফার্নান্দেজ ঠাণ্ডা মাথায় বলটা জড়ালেন ইংলিশদের জালে। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে ১-১ গোলে সমতা ফেরাল আর্জেন্টিনা।
এনজো এই চেষ্টাটা বহু আগে থেকে করে আসছিলেন। অন্তত ৩টি শট নিয়েছিলেন। শুরুর দুটো লক্ষ্যের বাইরে দিয়ে গেছে, তৃতীয়টা দারুণভাবে সেভ করেছিলেন পিকফোর্ড, চতুর্থবারের চেষ্টায় ভাগ্যের সহায়তা পেলেন তিনি। এরইসাথে ফাইনালে উঠার আশা জিইয়ে রেখে দারুনভাবে খেলায় ফিরে আসে আর্জেন্টিনা।
এর আগে, ম্যাচের ৫৫ মিনিটে এল প্রথম গোল, সেটা পেল ইংল্যান্ড। ডান পাশ থেকে মরগান রজার্সের নিচু ক্রস ফারপোস্টে চলে আসে অ্যান্থনি গর্ডনের কাছে। সেটা তিনি দারুণ এক ফিনিশে জড়ান আর্জেন্টিনার জালে।
টুখেলের রক্ষণাত্মক সিদ্ধান্তই কাল
গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর ম্যাচে গতি আসে দ্বিতীয়ার্ধে। ৫৫ মিনিটে হ্যারি কেইনের আক্রমণ প্রতিহত করলেও বল যায় ডেকলান রাইসের কাছে। রাইস দ্রুত বল তুলে দেন মরগান রজার্সের পায়ে। অ্যাস্টন ভিলার মিডফিল্ডারের নিখুঁত ক্রসে ডিফেন্ডার নাহুয়েল মোলিনাকে ফাঁকি দিয়ে গোল করেন অ্যান্থনি গর্ডন।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল একাদশে সুযোগ পেয়ে অ্যাসিস্ট করেন রজার্স। অন্যদিকে চলতি বিশ্বকাপে গর্ডনের এটি দ্বিতীয় গোল।
গোল হজমের পর বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে আক্রমণের ধার বাড়ান কোচ লিওনেল স্কালোনি। নিকো গঞ্জালেস, রদ্রিগো ডি পল, নিকোলাস ওতামেন্দি, গঞ্জালো মন্টিয়েল এবং পরে লাউতারো মার্তিনেজকে মাঠে নামান তিনি।
৬৯ মিনিটে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে নিকো গঞ্জালেসের হেড অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন জর্ডান পিকফোর্ড। ৭৬ মিনিটে ডি পলের ক্রসে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসে। পরের মিনিটেই গঞ্জালেসের আরেকটি হেড অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়।
গোল আদায় করেই পুরোপুরি রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলার উদ্দেশ্যে ৭২ মিনিটে গোলদাতা গর্ডনকে তুলে এজরি কনসাকে নামিয়ে পাঁচ ডিফেন্ডারের কৌশল নেন ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল। পরে ড্যান বার্ন ও নিকো ও'রাইলিকেও মাঠে নামিয়ে রক্ষণ আরও ভারী করেন তিনি।
এই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রক্ষণে গুটিয়ে যাওয়ায় পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আর্জেন্টিনার হাতে। অবশেষে খেলার ৮৫ মিনিটে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে ফেরান অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
দূর থেকে এনজো ফার্নান্দেজের শট দুর্দান্তভাবে কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন পিকফোর্ড। সেই কর্নারের ধারাবাহিক আক্রমণে বল আবারও মেসির কাছে আসে। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক নিখুঁতভাবে বল বাড়িয়ে দেন ফার্নান্দেজকে। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া বাঁকানো শটে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে ম্যাচে সমতা ফেরান চেলসি মিডফিল্ডার।
এই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে টানা ১১টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করার বিরল রেকর্ড গড়েন মেসি।
অতিরিক্ত সময়ে শেষ আঘাত
সমতায় ফেরার পরও থামেনি আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময় শেষে যোগ করা ৯ মিনিটের দ্বিতীয় মিনিটে আসে ম্যাচের নিষ্পত্তি।
ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট প্রতিহত হওয়ার পর বল যায় মেসির কাছে। মুহূর্তের মধ্যে তিনি বক্সে ভাসিয়ে দেন দারুণ এক চিপ পাস। সেখানে দৌড়ে এসে শক্তিশালী হেডে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন বদলি লাউতারো মার্তিনেজ।
আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলটি ইংল্যান্ডের হৃদয় ভেঙে দেয়। ইন্টার মিলানের এই স্ট্রাইকার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও অতিরিক্ত সময়ে গোল করেছিলেন। এবারও বদলি নেমে দলকে ফাইনালের টিকিট এনে দিলেন।
গোল হজমের পর মরিয়া হয়ে ইভান টনি ও মার্কাস রাশফোর্ডকে নামান টমাস টুখেল। তবে আর্জেন্টিনার সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারেনি থ্রি লায়ন্সরা। শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টাইন শিবির। আর হতাশায় ভেঙে পড়ে ইংল্যান্ড।
নিউজার্সিতে স্পেন-আর্জেন্টিনা মহারণ
এই জয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। গতকাল বিশ্বকাপের হাই ভোল্টেজ প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে আগেই ফাইনাল নিশ্চিত করেছে স্পেন।
এখন ফুটবল বিশ্বের চোখ নিউ জার্সির দিকে। যেখানে শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল স্পেন। সবশেষে আবারও প্রমাণ করলেন লিওনেল মেসি—বড় মঞ্চে তিনিই এখনো আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা।
Shamiur Rahman
