ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশ প্রশাসন: পুনর্গঠন থেকে বিতর্ক

৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপট, পরিবর্তন এবং ডিআইজি দ্বয়ের ভূমিকা

জামাল উদ্দিন খান, ময়মনসিংহ প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০২৬ ০১:৩৯ এএম

৫ আগস্ট-পরবর্তী ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশের এই দুই অধ্যায় প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির দুটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে ছিল সংকট কাটিয়ে আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠনের উদ্যোগ, অন্যদিকে ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পদায়নকে ঘিরে নানা বিতর্ক

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের অন্যান্য প্রশাসনিক খাতের মতো পুলিশ প্রশাসনেও আসে ব্যাপক পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সংকট এবং জনআস্থার ঘাটতি কাটিয়ে নতুন বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে পুলিশ বাহিনী।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশ। এখানে দায়িত্ব পালন করেন দুই ভিন্নধর্মী ডিআইজি—ড. মো. আশরাফুর রহমান এবং পরবর্তীতে মো. আতাউল কিবরিয়া। তাঁদের দায়িত্বকাল ঘিরে প্রশাসনিক কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনমনে ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

এই দুই শীর্ষ কর্মকর্তার দায়িত্বকাল পর্যালোচনা করলে ময়মনসিংহের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামোর এক স্পষ্ট পরিবর্তন ফুটে ওঠে যা নিম্নে তুলে ধরা হলো।

সংকটকালীন ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমান

গণ-অভ্যুত্থানের সুদূরপ্রসারী ধাক্কায় সারা দেশের পুলিশ প্রশাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। এসময় ময়মনসিংহ রেঞ্জের পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও ছিল চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা। অনেক সদস্য কর্মস্থলে ফিরতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. মো. আশরাফুর রহমান।

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং পুলিশ সদস্যদের মনোবল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন।

অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান

ড. আশরাফুর রহমানের দায়িত্বকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জোরালো অভিযান পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁর প্রায় ছয় মাসের দায়িত্বকালে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৮০০ নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়।

এ সময় মাদক, জুয়া, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হয়। পাশাপাশি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও জনবহুল এলাকায় সচেতনতামূলক সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ

ড. আশরাফুর রহমানের সময় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী সময়ে পদোন্নতিবঞ্চিত ও কোণঠাসা হয়ে পড়া কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে প্রশাসনিক ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়।

একই সময়ে রেঞ্জ কার্যালয়ে অত্যাধুনিক 'রেঞ্জ কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার' প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে মিডিয়া সেন্টার, অপারেশন মনিটরিং ইউনিট এবং আইসিটি ইউনিট যুক্ত হওয়ায় পুলিশি কার্যক্রমে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার সূচনা হয়।

বদলি ঘিরে নানা আলোচনা

ড. আশরাফুর রহমানের বদলিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণে অপরাধী চক্র ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। এমনকি তাঁকে সরিয়ে দিতে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সরকারি প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

আতাউল কিবরিয়ার বিতর্কিত ভূমিকা

ড. আশরাফুর রহমানের বদলির পর ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. আতাউল কিবরিয়া।

তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, পূর্বে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির জামিনের পর তাঁদের একটি অংশ দেশত্যাগ করেন এবং অন্যরা এলাকায় পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পান। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে ডিআইজির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ওসি পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদায়নকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, রেঞ্জের ৩৬টি থানার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক থানায় এমন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাদের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

বিশেষ করে ভালুকা মডেল থানায় একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সেবা ও গণমাধ্যমের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক

ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার দায়িত্বকাল নিয়ে আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল সেবাগ্রহীতা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে আচরণ। বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, রেঞ্জ কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে তাঁরা অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত বদলি

ময়মনসিংহ রেঞ্জে পদায়নের পর থেকেই ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার বিভিন্ন কার্যক্রম ও ফ্যাসিস্ট বিতর্কিত ওসি নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনীতি ও গণমাধ্যমে তুমুল তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেওয়ায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে।

এমতাবস্থায় ক্রমবর্ধমান বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ডিআইজি আতাউল কিবরিয়াকে ময়মনসিংহ রেঞ্জ থেকে বদলি করে অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) বদলি করা হয়। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান।

নতুন নেতৃত্বে নজর

৫ আগস্ট-পরবর্তী ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশের এই দুই অধ্যায় প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির দুটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে ছিল সংকট কাটিয়ে আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠনের উদ্যোগ, অন্যদিকে ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পদায়নকে ঘিরে নানা বিতর্ক।

ড. আশরাফুর রহমান যেখানে ভেঙে পড়া পুলিশ প্রশাসনকে আইনি শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনতে ও অপরাধ দমনে কঠোর ভূমিকা রেখেছিলেন, সেখানে আতাউল কিবরিয়ার আমল বিতর্ক, রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং প্রশাসনিক অসন্তোষের কারণে বারবার শিরোনাম হয়েছে।

বর্তমান নতুন নেতৃত্বের অধীনে ময়মনসিংহ রেঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্বচ্ছতা এবং জনবান্ধব পুলিশি সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় কি না, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট সবার নজরে।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত