মাদারীপুরের শিবচরে বৃদ্ধাশ্রম নির্মানের উদ্যোগ
শিল্পী নচিকেতার এই গানে চোখের পানি বাঁধ মানে না কারো।
মাদারীপুরের শিবচরে বৃদ্ধাশ্রম নির্মানের উদ্যোগ
‘ছোট্টবেলায় স্বপ্ন দেখে উঠত খোকা কেঁদে
দুহাত দিয়ে বুকের কাছে রেখে দিতাম বেঁধে
দুহাত আজও খুঁজে, ভুলে যায় যে একদম—
আমার ঠিকানা এখন বৃদ্ধাশ্রম!’
শিল্পী নচিকেতার এই গানে চোখের পানি বাঁধ মানে না কারো। একা মা দুই হাতে তাঁর ১০-১২ জন সন্তান স্নেহ-ভালোবাসায় লালন করেন।
কিন্তু শেষ বয়সে সেই ১০-১২ জনের ডজনখানেকের ওপর হাত একা মায়ের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। মা যেমন সন্তানের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, তেমনি বৃদ্ধ বয়সে সন্তানও মায়ের সবচেয়ে বড় নির্ভরতা। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে অনেক মায়েরই সৌভাগ্য হয় না সন্তানকে আঁকড়ে থাকার। এক্ষেত্রে বৃদ্ধাশ্রমই হয়ে ওঠে অনেক মায়ের শেষ আশ্রয়। বদলে যাওয়া সমাজে এটি হয়ে উঠছে শেষ বয়সের এক আশ্রয়স্থল।
এমন বাস্তবতায় মাদারীপুরের শিবচরে একটি বৃদ্ধাশ্রম নির্মানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের বহুল আলোচিত অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র সম্পাদক ও প্রকাশক, টিভি উপস্থাপক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং আরএনটিসি গ্রুপের চেয়ারম্যান মো: মতিউর রহমান এই মানবিক উদ্যোগের স্বপ্নদ্রষ্টা।
তার এই স্বপ্নের প্রকল্পের নাম "বৃদ্ধানিবাস শিবচর" -- যেখানে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নয়, বরং যত্ন, সম্মান ও নিরাপত্তার এক বিকল্প আবাস গড়ে তোলা হবে বলে প্রত্যাশা মতিউর রহমানের। এখানে চিকিৎসা, সঙ্গ এবং মানবিক পরিচর্যার মধ্যে নতুন করে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী তিনি।
বাড়ছে প্রবীণ, বদলাচ্ছে সমাজ
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জনে, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। জনসংখ্যার এই একটি বড় অংশ এখন প্রবীণ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যা দেশের সামাজিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা তৈরি করছে।
গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আগে যেখানে সংক্রামক রোগ ও অপুষ্টি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, এখন সেখানে অসংক্রামক রোগ, বার্ধক্যজনিত জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা উন্নয়ন তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩ দশমিক ৬ কোটিতে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ হবে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের একজনই হবেন প্রবীণ।
এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, সামাজিক কাঠামোতেও বড় প্রভাব ফেলছে। যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়ে ছোট পরিবারে রূপ নেওয়া, কর্মসংস্থানের কারণে সন্তানদের শহর বা বিদেশে অবস্থান এবং নারীদের কর্মজীবনে যুক্ত হওয়ার কারণেও প্রবীণদের দেখভালের প্রচলিত পারিবারিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক প্রবীণ একাকিত্ব, মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অসুস্থতা ও শারীরিক অক্ষমতার কারণে অনেক প্রবীণ ধীরে ধীরে অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। একই সঙ্গে তারা একাকিত্ব ও অবহেলার শিকার হন, যা তাদের শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটায়। বিশেষ করে ডিপ্রেশন, আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগ প্রবীণদের জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ডিমেনশিয়া বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য আবাসিক বা প্রাতিষ্ঠানিক যত্নকেন্দ্র গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে তারা নিরাপদ, সম্মানজনক ও পেশাদার পরিচর্যার মধ্যে থাকতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত বর্ধনশীল এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এটি বড় সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।
Shamiur Rahman
