বিলুপ্তির পথে জোনাকির আলো

নেহাল আহমেদ প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট ২০২৬ ০১:০৭ পিএম

জোনাকি প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। বিজ্ঞানের ভাষায় তাদের আলোক বিচ্ছুরণের ক্ষমতাকে বলা হয় জৈব আলোকধারা বা বায়োলুমিনেসেন্স। পৃথিবীতে দুই হাজারেরও বেশি প্রজাতির জোনাকি রয়েছে

পৃথিবী থেকে কোনো সৌন্দর্য কখনো হঠাৎ হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যাওয়ার আগে সে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের উদাসীনতার কাছে পরাজিত হতে থাকে। জোনাকির আলোও তেমনই এক নীরব পরাজয়ের ইতিহাস।

একসময় গ্রামে রাতের নিজস্ব একটি ভাষা ছিল। সেই ভাষা লেখা হতো অন্ধকারের ক্যানভাসে। দূরের বাঁশঝাড়ে বাতাসের মৃদু সুর, কুয়াশার নরম চাদর, ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, আর ঘাসের ডগায় ডগায় জ্বলে ওঠা শত শত জোনাকি—মনে হতো, আকাশের তারারা নেমে এসে পৃথিবীর সঙ্গে গল্প করছে। অন্ধকার তখন ভয়ের ছিল না; অন্ধকার ছিল আলোর জন্মভূমি।

শৈশবের সন্ধ্যাগুলো কেটেছে সেই আলোর পিছু ছুটে। মুঠোভর্তি জোনাকি যেন ছিল বিস্ময়ের ছোট্ট একটি মহাবিশ্ব। তাদের ধরে আবার উড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত আনন্দ—যেন আলোকে কখনো বন্দি করা যায় না, তাকে শেষ পর্যন্ত মুক্ত আকাশেই ফিরে যেতে হয়।

আজও রাত নামে। চাঁদ ওঠে, বাতাস বয়ে যায়, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকও শোনা যায়। কিন্তু কোথায় সেই অসংখ্য জোনাকি? কোথায় সেই ঝিকিমিকি আলোর মিছিল? মনে হয়, শুধু একটি পোকাই নয়, আমাদের শৈশবের একটি ঋতু, আমাদের গ্রামের একটি ভাষা, আমাদের স্মৃতির একটি নক্ষত্রও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

জোনাকি প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। বিজ্ঞানের ভাষায় তাদের আলোক বিচ্ছুরণের ক্ষমতাকে বলা হয় জৈব আলোকধারা বা বায়োলুমিনেসেন্স। পৃথিবীতে দুই হাজারেরও বেশি প্রজাতির জোনাকি রয়েছে। তাদের আলো তাপহীন—প্রায় সম্পূর্ণ শক্তিই আলোতে রূপান্তরিত হয়। তাই বিজ্ঞানীরা একে বলেন শীতল আলো। মানুষ হাজার প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে, কিন্তু প্রকৃতির এই নিখুঁত আলোর দক্ষতাকে এখনো পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারেনি।

কিন্তু জোনাকির আলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়। এই আলো তাদের প্রেমের ভাষা, অস্তিত্বের পরিচয়, বেঁচে থাকার সংকেত। অন্ধকারে তারা আলো জ্বেলে সঙ্গীকে খুঁজে নেয়, নিজেদের পরিচয় দেয়, বিপদের সতর্কবার্তা পাঠায়। মানুষের মতো তাদেরও একটি নীরব যোগাযোগব্যবস্থা আছে—শুধু সেই ভাষা শব্দে নয়, আলোয় লেখা। তবু সেই ভাষা ক্রমশ নির্বাক হয়ে পড়ছে।

মানুষ রাতকে আর রাত থাকতে দেয়নি। শহরের পর গ্রামও আজ বৈদ্যুতিক আলোর দখলে। স্ট্রিটলাইট, বাজার, বিলবোর্ড, বাড়ির সাজসজ্জা—সব মিলিয়ে অন্ধকার যেন নির্বাসিত। অথচ জোনাকির ভালোবাসা জন্ম নেয় অন্ধকারে। কৃত্রিম আলোর ভিড়ে তারা সঙ্গীর সংকেত হারিয়ে ফেলে। প্রেম ব্যর্থ হয়, প্রজনন কমে যায়, আর একটি প্রজন্ম নিঃশব্দে হারিয়ে যায়।

কৃষিজমিতে নির্বিচারে ছড়িয়ে দেওয়া কীটনাশকও তাদের মৃত্যুর আরেকটি কারণ। বিষাক্ত মাটিতে জোনাকির লার্ভা আর বেড়ে উঠতে পারে না। আমরা ফসল রক্ষা করি, কিন্তু অজান্তেই ধ্বংস করি সেই প্রাণগুলোকে, যারা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে।

অপরিকল্পিত নগরায়ন, বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট এবং জলবায়ু পরিবর্তন জোনাকির পৃথিবীকে ক্রমশ সংকুচিত করে তুলছে। প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষত শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে এই ক্ষুদ্র প্রাণীর শরীরে।

জোনাকির হারিয়ে যাওয়া তাই কেবল একটি পতঙ্গের বিলুপ্তির গল্প নয়। এটি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার ইতিহাস। আমরা যত সভ্য হয়েছি, ততই হারিয়েছি রাতের অন্ধকার, পাখির গান, প্রজাপতির রঙ, শিশিরের নীরবতা—আর সেই সঙ্গে হারিয়েছি জোনাকির আলোও।

হয়তো একদিন আমাদের সন্তানেরা বইয়ের পাতায় জোনাকির ছবি দেখবে, কিন্তু বাস্তবের রাতের আকাশে আর দেখবে না তার আলো। তখন তারা জানতে চাইবে—এত সুন্দর একটি প্রাণী কোথায় হারিয়ে গেল? আমরা কী উত্তর দেব? বলব, উন্নয়নের নামে আমরা অন্ধকারকে হত্যা করেছি, আর অন্ধকারের সঙ্গে মুছে দিয়েছি তার সবচেয়ে সুন্দর ভাষাটিকেও?

জোনাকিকে ফিরিয়ে আনার অর্থ কেবল একটি প্রজাতিকে রক্ষা করা নয়; এর অর্থ প্রকৃতির প্রতি মানুষের হারিয়ে যাওয়া দায়বোধ ফিরিয়ে আনা। অপ্রয়োজনীয় আলোকদূষণ কমানো, কীটনাশকের সচেতন ব্যবহার, বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান—এসবই হতে পারে সেই হারানো আলোর পথে প্রথম পদক্ষেপ।

কারণ জোনাকি কেবল একটি পোকা নয়। জোনাকি হলো অন্ধকারের বুকে লেখা প্রকৃতির সবচেয়ে ক্ষুদ্র কবিতা।

যেদিন পৃথিবী থেকে শেষ জোনাকিটিও হারিয়ে যাবে, সেদিন হয়তো আমরা শুধু একটি প্রাণী হারাব না; হারাব আমাদের শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি, হারাব রাতের নীরবতার সবচেয়ে সুন্দর অলংকার, হারাব মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সেই প্রাচীন বন্ধনের শেষ আলোকবিন্দুটিও।

লেখক একজন বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক, কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন কর্মী।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত