মন্ত্রিসভা কমিটিকে পাশ কাটিয়ে দরপত্র অনুমোদনের অভিযোগ ভিসির বিরুদ্ধে; এক বছরেও নেই কোনো ব্যবস্থা
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০৮ কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি
প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে ভিসি, ট্রেজারার ও প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ; সুবিধা পায় দুই প্রতিষ্ঠান। এরপরও অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে
সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার দরপত্র নিজ ক্ষমতায় অনুমোদন দিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। অথচ সরকারি আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ বিধি অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের কোনো ক্রয়চুক্তি অনুমোদনের এখতিয়ার কেবল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির। কিন্তু সেই বিধান পাশ কাটিয়ে বিপুল অঙ্কের এই ক্রয় অনুমোদনের পাশাপাশি পুরো দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিড রিগিং (টেন্ডার কারসাজি), প্রতিযোগিতা সীমিত করা, অতিরিক্ত শর্ত আরোপ এবং পূর্বনির্ধারিত দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে এসব অনিয়ম সুস্পষ্টভাবে উঠে এলেও প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। তবুও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তদন্তে ভিসিসহ পাঁচ পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ
প্রতিযোগিতা কমিশনের মামলা নং-০৩/২০২৫-এর অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ টি এম জাফরুল আজম এবং প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর ১৫ ধারা লঙ্ঘন করেছেন।
একইসঙ্গে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড এবং প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধেও টেন্ডার কারসাজি ও যোগসাজশের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
কমিশনের তদন্তে বলা হয়েছে, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয় এবং নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়।
অভিযোগের সূত্রপাত
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় লিথোকোড ও কিউআর কোডযুক্ত ওএমআর ফরম ও উত্তরপত্র সরবরাহের জন্য দুটি লটে দরপত্র আহ্বান করে। এই প্রক্রিয়ায় কারসাজির অভিযোগ এনে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে আবেদন করেন বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সচিব এ. কে. এম. নওশেরুল আলম।
তদন্তে দেখা যায়, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম) অনুসরণের কথা থাকলেও বাস্তবে এমন শর্ত আরোপ করা হয়, যা পূরণ করতে সক্ষম ছিল মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান।
পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিলেও কারিগরি মূল্যায়নে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। শেষ পর্যন্ত শুধু মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ও প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডকে যোগ্য ঘোষণা করে একটি করে লটের কাজ দেওয়া হয়।
লট-১-এর জন্য মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডকে ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং লট-২-এর জন্য প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডকে ৫৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ফলে মোট চুক্তির মূল্য দাঁড়ায় ১০৮ কোটি ৫৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যা প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
মন্ত্রিসভা কমিটিকে পাশ কাটিয়ে অনুমোদন
সরকারি আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ বিধি অনুযায়ী, অ-উন্নয়ন বাজেটের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকার ক্রয় অনুমোদন করতে পারেন। ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকার চুক্তির অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের। আর ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের যেকোনো ক্রয়চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা একমাত্র সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির।
কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, এসব বিধান অনুসরণ না করে ভিসি নিজেই ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদন করেন। কমিশনের মতে, এর মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া লঙ্ঘিত হয়েছে এবং চুক্তিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
একই ক্রয়ে তিন ধরনের পদ্ধতি
তদন্তে উঠে এসেছে আরও একটি অস্বাভাবিক তথ্য। দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ ছিল ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম)। কিন্তু বাস্তবে ব্যবহার করা হয়েছে ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপস টেন্ডারিং মেথডের স্ট্যান্ডার্ড টেন্ডার ডকুমেন্ট (এসটিডি)। পরে চুক্তিপত্রে সেটিকে আবার ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই ক্রয়কার্যে তিন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়টিকে কমিশন বিধিবহির্ভূত ও অস্বচ্ছ বলে উল্লেখ করেছে। এমনকি বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) পণ্য ক্রয়ের জন্য এ ধরনের এসটিডি অনুমোদনই দেয়নি।
অতিরিক্ত শর্তে বাদ পড়ে তিন প্রতিষ্ঠান
এসটিডি অনুযায়ী একই ধরনের একটি কাজ সম্পন্নের অভিজ্ঞতা থাকলেই যোগ্য হওয়ার কথা। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অতিরিক্ত শর্ত হিসেবে গত তিন বছরে অন্তত দুটি ৪০ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করে।
অন্যদিকে সম্ভাব্য দরদাতার আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রচলিত শর্ত রাখা হয়নি।
ফলে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি মূল্যায়নে অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও কেন তারা অযোগ্য, তার কোনো ব্যাখ্যা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
কাজ ভাগাভাগির স্পষ্ট ইঙ্গিত
কমিশনের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে উঠে এসেছে দরদাতাদের মূল্য প্রস্তাবের ধরন।
একটি লটে মাস্টার সিমেক্স সর্বনিম্ন দরদাতা এবং প্রিন্ট মাস্টার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। অন্য লটে আবার প্রিন্ট মাস্টার সর্বনিম্ন এবং মাস্টার সিমেক্স দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা।
কমিশনের মতে, এটি স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ফল নয়; বরং পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
এছাড়া গত পাঁচ বছর ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ধরনের কাজ ধারাবাহিকভাবে মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড পেয়ে আসছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ না পাওয়াকে কমিশন একচেটিয়া বাজার তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদনও খারিজ
মামলার বাদী বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন তদন্ত চলাকালে অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদন করলেও প্রতিযোগিতা কমিশন তা গ্রহণ করেনি। কমিশন জানায়, স্বাধীনভাবে সংগৃহীত নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক তোফায়েল আহমেদ খান দাবি করেন, তাদের প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে এবং সব শর্ত পূরণ করেই কাজ পেয়েছে।
মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডের পরিচালক (বিপণন ও প্রশাসন) শেখ ইমরান হোসেন অভিযোগকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান কমিশনকে জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর এই ক্রয়কাজ সরল বিশ্বাসে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এতে কোনো অনিয়ম হয়নি।
একই অভিযোগে অন্য ভিসি গ্রেপ্তার, এখানে নীরবতা
একই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গত বছর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ কে এম নূর-উন-নবী ও নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনিক দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ উঠেছে।
টিআইবির প্রশ্ন
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয়খাতে অনিয়ম দীর্ঘদিনের সমস্যা। তদন্তে সুনির্দিষ্টভাবে অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তার মতে, বর্তমান সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিযোগিতা কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং দুদকের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
কমিশনের সুপারিশ
ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে সরকারি সব ক্রয় ই-জিপি ব্যবস্থার আওতায় আনা, প্রতিযোগিতা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, ব্লকচেইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে টেন্ডার কারসাজি শনাক্তের ব্যবস্থা চালু এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে প্রতিযোগিতা কমিশন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Shamiur Rahman
