জাল বিল-ভাউচার, তেল খরচ ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অভিযোগ; দুদকের তদন্তেও নথিতে গরমিল

হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করেও বিআইডব্লিউটিএতে বহাল ‘প্রভাবশালী’ কর্মকর্তা

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬ ০৭:১০ পিএম

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু ব্যক্তিগতভাবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, বিল অনুমোদনকারী কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণ শাখা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা সমন্বিতভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, জাল-জালিয়াতি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা এখনও স্বপদে বহাল থেকে একটি নিজস্ব বলয় তৈরি করে দপ্তরের কার্যক্রমে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছেন। 

নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, আব্দুর রহিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উদ্ধারকারী জাহাজের তেল খরচ, মেরামতসহ বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। 

এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অনেকের নামে দুদক এবং বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানের দপ্তরে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ জমা পড়লেও অদৃশ্য কারণে কোন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।

উদ্ধারকারী জাহাজের তেল খরচে অনিয়মের অভিযোগ

বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগে দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত জাহাজের তেল খরচ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সূত্রগুলো বলছে, নারায়ণগঞ্জে আগে ‘প্রত্যয়’ ও ‘নির্ভীক’ নামে দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ ছিল। বর্তমানে ‘নির্ভীক’ বরিশাল থেকে পরিচালিত হলেও ‘প্রত্যয়’ নারায়ণগঞ্জ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ২৫০ টন উত্তোলন ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজটি নারায়ণগঞ্জ শহরের ৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে নোঙর করে রাখা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এই জাহাজ পরিচালনা ও উদ্ধারকাজের নামে প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকা তেল খরচের বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে। এi বিষয়ে দুদকের তদন্তে নথিপত্রে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার, জাহাজের লগবুক, তেল গ্রহণ ও ব্যবহার রেজিস্টার এবং অর্থ পরিশোধের নথি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের নামে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল?

নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, বয়া ও বিকন বাতির মতো সরঞ্জাম প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে সরকারি অর্থ পরিশোধের ঘটনা ঘটেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই বছরের পর বছর ওই বিভাগের বিভিন্ন কাজ পেয়ে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ, ব্যাংক হিসাব, কাজ পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খতিয়ে দেখলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে কথিত ‘ভুয়া বিল’

অভিযোগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম এবং নির্দিষ্ট বিলের অঙ্ক উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী—

  • আখি এন্টারপ্রাইজ—টিপি-১৩৫-এর নামে কথিত ভুয়া বিল বাবদ ৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা;

  • তানিয়া এন্টারপ্রাইজ—এমপি-১২-এর নামে কথিত ভুয়া বিল বাবদ ৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা;

  • তানজিল ডক ইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস—টিপি-৮০-এর নামে কথিত ভুয়া বিল বাবদ ৭ লাখ ১৩ হাজার ৩৫২ টাকা;

  • একই প্রতিষ্ঠানের নামে টিপি-১৭৩-এর কথিত ভুয়া বিল বাবদ ৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা;

  • তানিয়া এন্টারপ্রাইজ—স্পিডবোট-১ মেরামতের নামে কথিত বিল বাবদ ৮ লাখ ৮৪ হাজার ১০০ টাকা;

  • আলিফ এন্টারপ্রাইজ—টিপি-৪৫-এর নামে কথিত ভুয়া বিল বাবদ ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১৫১ টাকা।

তবে এসব অর্থ প্রকৃতপক্ষে আত্মসাৎ করা হয়েছে কি না, বিলগুলো ভুয়া কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আব্দুর রহিমের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা সরকারি নথি, টেন্ডার প্রক্রিয়া, কার্যাদেশ, পরিমাপ বই, বিল অনুমোদন এবং ব্যাংক লেনদেন যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অভিযোগ

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ‘বাহার’ নামে পরিচিত এক ঠিকাদারের সঙ্গে আব্দুর রহিমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই বলয় বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত সম্পর্ক আড়াল করে বিভিন্ন নামে কাজ নেওয়া হয়েছে। একই কর্মকর্তা বা তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাবাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কাজ পেয়ে থাকলে সেটি সরকারি ক্রয়বিধি ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে।

বিপুল সম্পদের পাহাড়

আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে চাকরিজীবনের আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, উত্তর মুগদার ৫৮/৩০/গ নম্বর বাড়ির ‘আলিফ গার্ডেন’ নামের ভবনে তার দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। একই এলাকার ঝিলপাড় রোডের ৫৪ নম্বর বাড়িতে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের আরও দুটি ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ফতুল্লা লঞ্চঘাটের নদীর পশ্চিম পাড়, কেরানীগঞ্জ থানা এলাকায় কথিতভাবে ঠিকাদার বাহারের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ডকইয়ার্ড নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।

আশুলিয়ার ইসলামনগর, পাথালিয়া ইউনিয়নে আরএস দাগ নম্বর ১৮৩৩-এ আব্দুর রহিম ও লিমা তাবাসসুমের নামে প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা একটি ভবন নির্মাণের দাবিও করা হয়েছে।

এছাড়া সাভার বাজারের ‘অন্ধ মার্কেট’-এর দ্বিতীয় তলায় দুটি দোকান, সাভারের কাঠগড়ায় চার ইউনিটের সাততলা ভবন এবং মোহাম্মদপুর হাউজিং এলাকায় প্রায় ছয় শতাংশ জমি থাকার অভিযোগ রয়েছে। রামপুরা ও হাতিরপুল এলাকাতেও একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি থাকার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ঢাকা ও সাভারে তার নামে-বেনামে আরও জমি ও প্লট রয়েছে এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অর্থ জমা রয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও প্রকৃত মূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে, আব্দুর রহিমের এক নিকটাত্মীয়ের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, তার নিজ এলাকা পাবনার আশপাশে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে একটি হিন্দু পরিবারের বাড়ি কেনা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় জমির দলিল, নামজারি, খতিয়ান, রেজিস্ট্রি মূল্য, প্রকৃত মালিকানা এবং ক্রয়-বিক্রয়ের অর্থের উৎস যাচাই করা প্রয়োজন।

দুদক ও চেয়ারম্যানের দপ্তরে অভিযোগ, ব্যবস্থা কোথায়?

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, আব্দুর রহিমসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে দুদক এবং বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানের দপ্তরে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু ব্যক্তিগতভাবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, বিল অনুমোদনকারী কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণ শাখা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা সমন্বিতভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

উত্থাপিত এসব অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিআইডব্লিউটিএর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ আব্দুর রহিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

Shamiur Rahman

সম্পর্কিত